ডিসেম্বরে ফিরছেন শেখ হাসিনার: রাজনীতিতে নতুন মোড় নাকি শুধুই মনস্তাত্ত্বিক কৌশল?

শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন | গণ আওয়াজ

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকার এবং এর ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণ নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে রাজনৈতিক তোলপাড় শুরু হয়েছে। টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছাড়ার পর এই প্রথম শেখ হাসিনা সরাসরি কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিলেন। ভারতে নির্বাসিত এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কার জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসবেন এবং আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার এই স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তন ও আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে। বাংলাদেশ সরকার তাকে হস্তান্তরের জন্য ভারতের কাছে বারবার আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠালেও, তিনি কোনো আইনি জটিলতার অপেক্ষা না করে নিজেই দেশে ফিরতে চান। শুধু তিনি একাই নন, তার দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা, যাদের অনেকে ইতিমধ্যেই মানবতাবিরোধী অপরাধসহ বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত, তারা সবাই একযোগে আদালতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন। শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছেন যে, তিনি বিচার প্রক্রিয়া শুরু করার মাধ্যমে দেশের বর্তমান আইনি ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং তাদের ভাষায় আদালতের প্রহসন জনগণের সামনে প্রমাণ করতে চান। একই সঙ্গে নিজের জীবনের তীব্র ঝুঁকির কথা স্বীকার করে তিনি জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার বা মৃত্যুর ভয় উপেক্ষা করেই নিজের মাটিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে তিনি বদ্ধপরিকর।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর পরই বাংলাদেশের মূলধারার পত্রিকাগুলো এর বাস্তবায়নযোগ্যতা এবং এর পেছনের রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু করেছে। দেশি সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আত্মগোপনে বা নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগের মাঝারি ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের একটি বড় অংশ এই ঘোষণার পেছনের সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কৌশল বা পূর্বপ্রস্তুতি সম্পর্কে অন্ধকারে রয়েছেন। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি মূলত মাঠপর্যায়ে চরম হতাশায় থাকা দলীয় নেতা-কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করার একটি মনস্তাত্ত্বিক চেষ্টা। মামলার জালে জর্জরিত এবং কোণঠাসা হয়ে থাকা তৃণমূল কর্মীদের পক্ষে এই মুহূর্তে সুসংগঠিত হয়ে দলীয় প্রধানের সাথে আদালতে আসা কতটুকু সম্ভব, তা নিয়ে তীব্র সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে দেশীয় গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে। অপরদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব ও বর্তমান রাজনৈতিক পক্ষগুলো এই ঘোষণাকে দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনের দায় এড়ানোর এবং দেশের বর্তমান স্থিতিশীল পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করার একটি অপচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
যদি শেখ হাসিনা তার ঘোষণা অনুযায়ী দলের শীর্ষ ও মাঝারি সারির নেতাকর্মীদের নিয়ে সত্যি ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করেন, তবে বাংলাদেশের রাজনীতি এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলায় এক নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। আইনি প্রক্রিয়ার দিক থেকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা অন্যান্য মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা থাকায় দেশে পা রাখা মাত্রই তাকে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করে কারাবন্দী করা হবে। এর ফলে দেশের আদালতগুলোতে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে হাইপ্রোফাইল ও স্পর্শকাতর বিচারিক কার্যক্রম শুরু হবে, যা বিচার বিভাগ ও প্রশাসনের জন্য হবে এক বিশাল পরীক্ষা।
একই সাথে এই ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খল পরিস্থিতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত দুই বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে দেশ যখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছিল, ঠিক তখন শেখ হাসিনার এই আগমন রাজনৈতিক মেরুকরণকে চরম রূপ দিতে পারে। একদিকে দলীয় প্রধানের মুক্তির দাবিতে আওয়ামী লীগের অবশিষ্ট সমর্থকদের আইনি ও রাজপথের লড়াইয়ের চেষ্টা, অন্যদিকে গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তির কঠোর অবস্থান—এই দুইয়ের মুখোমুখি সংঘাতের ফলে রাজপথে তীব্র উত্তেজনা ও সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে ভূ-রাজনীতি ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়াকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নতুন দিল্লির মধ্যে যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, তিনি নিজে স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে এলে ভারতের ওপর থেকে সেই আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক চাপ অনেকটাই কমে যাবে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জটিলতা কিছুটা হ্রাস পাওয়ার পথ সুগম হতে পারে।
চূড়ান্ত বিচারে, রয়টার্সের মাধ্যমে শেখ হাসিনার এই বার্তা মূলত একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক চাল হিসেবেই গণ্য হচ্ছে। সশরীরে জেলে গিয়ে বা আইনি প্রক্রিয়া মোকাবেলা করে তিনি দলকে রাজনৈতিকভাবে জীবিত রাখার শেষ চেষ্টা করতে পারেন, যা নিষিদ্ধ বা নিষ্ক্রিয় থাকা দলটির জন্য হবে একটি মরণপণ পরীক্ষা। এই ঘোষণা যদি কেবলই রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল না হয়ে বাস্তবে রূপ নেয়, তবে আগামী ডিসেম্বর মাসটি বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতির মোড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান একটি মাইলফলক হতে যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *