‘মুসলিম পরিচয়ের ইঙ্গিত?’—এ আর রহমানের বিস্ফোরক মন্তব্য, বিপাকে কপিল শর্মা!

শেয়ার করুন

এ আর রহমান বিতর্ক: মুসলিম পরিচয়, বলিউড রাজনীতি ও কপিল শো নিয়ে তোলপাড় | সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ
A R Rahman Controversy: Muslim Identity, Bollywood Politics & Kapil Sharma Show Row | Full Report

অস্কার জয় থেকে শুরু করে বিশ্বসংগীতের মঞ্চ কাঁপানো— তিন দশকের বর্ণিল ক্যারিয়ারে এ আর রহমান মানেই এক ইতিহাস। কিন্তু সেই ‘মাদ্রাজ মোজার্ট’ যখন খোদ বলিউডে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন থমকে যায় পুরো বিনোদন জগত। সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রহমান যা দাবি করেছেন, তা যেন আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ!

কেন গত ৮ বছর ধরে বলিউডে তাঁর কাজ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে? কেন একজন অস্কারজয়ীকে বলতে হলো যে তিনি ধর্মীয় বিভাজনের শিকার? এই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছেন বলিউড ‘কুইন’ কঙ্গনা রনৌত এবং বিজেপি নেতারা। পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন এই উত্তপ্ত আবহে কপিল শর্মা তাঁর শো-তে অতিথি করেন রহমানকে।

রহমানের এক মন্তব্য কি তবে টালমাটাল করে দিচ্ছে মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির রাজনৈতিক সমীকরণ? নীতেশ রানের হুঁশিয়ারি থেকে শুরু করে রহমানের পরিবারের একজোট লড়াই— জানুন পুরো ঘটনা, পর্দার পেছনের সেই অজানা সত্য।

মুসলিম হওয়ায় কোণঠাসা: এ আর রহমানের বিস্ফোরক মন্তব্য ও বিপাকে কপিল শর্মা

তিন দশকের সংগীতজীবনে অগণিত হিট গান, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা— এমনকি অস্কারও জিতেছেন তিনি। বিশ্বসংগীতের দরবারে যাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, সেই এ আর রহমানই কি আজ বলিউডে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতির শিকার? সম্প্রতি এমনই এক বিস্ফোরক দাবি করে চাঞ্চল্য তৈরি করেছেন ‘মাদ্রাজ মোজার্ট’। বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্ককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, হিন্দি ছবিতে তাঁর কাজ কমে যাওয়ার পিছনে ইন্ডাস্ট্রির ‘পাওয়ার শিফট’ বা ক্ষমতার হাতবদল দায়ী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গত আট বছরে বলিউডে একের পর এক কাজ তাঁর হাতছাড়া হয়েছে। এর নেপথ্যে ধর্মীয় বিভাজন এবং অর্বাচীন ব্যক্তিত্বদের হাতে ক্ষমতা যাওয়াকেই দায়ী করেছেন তিনি।

রহমান বলেন, “ক্ষমতার বদলের পর থেকেই বলিউডে কাজের সুযোগ কমতে শুরু করেছে। কারণ এখন যাঁদের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, তাঁদের অনেকেই সৃজনশীল নন। এর সঙ্গে ধর্মীয় বিভাজনের বিষয়টিও যুক্ত থাকতে পারে। যদিও এসব কথা কেউ সরাসরি বলেনি, তবে কানাঘুষো শুনেছি।” দীর্ঘদিন ধরেই লক্ষ্য করা যাচ্ছিল যে, বলিউডের তুলনায় দক্ষিণী চলচ্চিত্র শিল্পে অস্কারজয়ী সুরকার এ আর রহমানের কাজের পরিমাণ ইদানীং অনেক বেশি। এবার নিজেই সেই জল্পনার নেপথ্যের কারণ সামনে আনলেন এই বিশ্ববরেণ্য সুরকার। কারও নাম না নিলেও রহমানের মন্তব্যে রাজনৈতিক দল বিজেপির দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকেই। মুসলিম ধর্মাবলম্বী হলে কি বলিউডে কাজ পাওয়া যায় না, নাকি বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে হিন্দি সিনেমায় ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি বেড়েছে— এই প্রশ্নগুলো এখন নতুন করে জনমনে উঠে আসছে।

তবে এই অভিযোগ কঠোরভাবে উড়িয়ে দিয়েছে ভারতের শাসকদল। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামদাস আতাওয়ালে বলেন, “রহমানের অভিযোগের সঙ্গে আমি একেবারেই একমত নই। হিন্দি চলচ্চিত্র জগতে সালমান খান, শাহরুখ খান, আমির খানের মতো বহু মুসলিম শিল্পী রয়েছেন, যাঁদের সারা দেশের মানুষ ভালোবাসেন।” বিজেপির সংখ্যালঘু মোর্চার সভাপতি সৈয়দ ভাষারও রহমানের দাবি খারিজ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিজেপি সরকারের আমলে কাজ পাননি— এ কথা ঠিক নয়। নইলে ‘স্লামডগ মিলিয়নেয়ার’ বা ‘মাদ্রাজ ক্যাফে’র মতো কাজ সম্ভব হতো না। তাঁর মতে, যোগ্যতার ভিত্তিতেই তিনি ২০২২ সালে জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন।

রহমানের দিকে আঙুল তুলে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন বলিউড অভিনেত্রী ও বিজেপি সাংসদ কঙ্গনা রনৌত। কাজ না পাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে কঙ্গনা লেখেন, ‘প্রিয় রহমানজি, আমি বিজেপিকে সমর্থন করি বলেই ইন্ডাস্ট্রিতে পক্ষপাতিত্ব ও বৈষম্যের শিকার হয়েছি। তবুও বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনার মতো পক্ষপাতদুষ্ট ও ঘৃণ্য মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি।’ নিজের পরিচালিত সিনেমা ‘ইমার্জেন্সি’র প্রসঙ্গ টেনে কঙ্গনা আরও বলেন, ‘আমি আমার পরিচালিত সিনেমার চিত্রনাট্য আপনাকে শোনাতে চেয়েছিলাম। গল্প পড়া তো দূরের কথা, আপনি আমার সঙ্গে দেখাও করতে অস্বীকার করেছিলেন। আমাকে বলা হয়েছিল, আপনি কোনো একপেশে প্রচারমূলক ছবির অংশ হতে চান না।’

রহমানের অভিযোগের পাল্টা যুক্তি দিয়েছেন বলিউডের আরেক জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী শান। তিনি বলেন, ‘আমি বলিউডে এত জনপ্রিয় গান গেয়েছি, তবু মাঝেমধ্যে কাজ পাই না। তবে বিষয়টিকে আমি ব্যক্তিগতভাবে নিই না। এ আর রহমান অনেক প্রতিভাবান কম্পোজার। তার জনপ্রিয়তা দিন দিন আরও বাড়ছে। আমার মনে হয় না, শিল্প-সংস্কৃতিতে কোনো সাম্প্রদায়িক বিষয় আছে। যদি সেটা হতো তাহলে আমাদের তিন সুপারস্টার এ দেশে এত বছর ধরে কাজ করতে পারতেন না। ভালো কাজ করতে হবে, ভালো মিউজিক করতে হবে, এসব নিয়ে না ভাবাটাই শ্রেয়।’

সম্প্রতি নিজের নতুন গানের প্রচারে ব্যস্ত এ আর রহমান পুত্র আমিন এক সাক্ষাৎকারে জানান, অস্কারজয়ী বাবার সঙ্গে কাজ করা একদিকে যেমন অনুপ্রেরণার, তেমনই কঠিনও। হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে সুযোগ নিয়ে রহমানের মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক বাড়লে প্রকাশ্যে বাবার পাশে দাঁড়িয়েছেন আমিন। ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে তিনি রহমানকে “লাইফের লেজেন্ড” বলে উল্লেখ করেন এবং লেখেন, তাঁর উত্তরাধিকার “চিরকাল ইতিহাসে লেখা থাকবে”। একই সুরে রহমানের কন্যা খাতিজা ও রহিমাও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘৃণা ও মিথ্যা আখ্যান ছড়ানোর বিরুদ্ধে সরব হন। সব মিলিয়ে, বিতর্কের মাঝেও এ আর রহমান পরিবারের একজোট অবস্থান এবং আমিনের সংযত বক্তব্য নতুন করে নজর কেড়েছে।

অনেকেই এ আর রহমানের বক্তব্যকে বলিউডে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের অভিযোগ হিসেবে দেখেছেন। আবার অনেকে বলেছেন, তিনি মূলত ক্ষমতার রাজনীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোর কথাই তুলে ধরেছেন, যা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিতর্ক তীব্র হওয়ার পর রহমান নিজেও ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, তাঁর উদ্দেশ্য কারও অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া নয়। সমালোচনার মুখে পড়ে আরেকটি পোস্টে তিনি জানান, সঙ্গীতের মাধ্যমে সবসময় ভারতের সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে আঘাত করা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না এবং তিনি একজন গর্বিত ভারতীয় হিসেবে দেশটির স্বাধীনতা উপভোগ করেন। যদিও নেটিজেনদের অনেকের দাবি, রাজনৈতিক চাপে পড়েই এমন ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি।

এই সমালোচনার মধ্যেই তাকে নেটফ্লিক্সের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান কপিল শো’-এর সাম্প্রতিক এক পর্বে অতিথি করেন জনপ্রিয় কৌতুকশিল্পী কপিল শর্মা। শো-তে ‘হুইস্পার গেম’ খেলার উদাহরণ টেনে রহমান বোঝান, কীভাবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌঁছতে পৌঁছতে কোনো বার্তা বিকৃত হয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, “এটি খুব ভালো একটি অনুশীলন কীভাবে তথ্য ভুলভাবে ছড়িয়ে পড়ে তা বোঝার জন্য। পৃথিবীর আসল সমস্যাটাই হল, বার্তাগুলো চলার পথে বিকৃত হয়ে যায়।’ অনুষ্ঠানে কোনো প্রশ্নেই তিনি বিতর্কের দিকে যাননি, বরং সচেতনভাবেই বিনোদনের সীমারেখার ভেতরে থাকতে চেয়েছেন।

তবে তাঁর এই উপস্থিতির পরও বিতর্ক থেমে থাকেনি। ক্ষুব্ধ হয়েছেন মহারাষ্ট্রের মন্ত্রী বিজেপি নেতা নীতেশ রানে। রানে প্রকাশ্যে অনুষ্ঠানের সমালোচনা করে বলেন, রহমানের সাম্প্রতিক মন্তব্য ভারতীয় ও হিন্দুসমাজের ভাবাবেগে আঘাত করেছে। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতিতে এত বড় বিনোদনমূলক মঞ্চে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো উচিত হয়নি। একই সঙ্গে তিনি ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর কনটেন্ট নীতিমালা নিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। সব মিলিয়ে কপিলের শোর এই পর্বটি হয়ে উঠেছে নিছক বিনোদনের চেয়েও বেশি কিছু। সমালোচকদের মতে, এটি দেখিয়েছে কীভাবে একজন শিল্পীর একটি মন্তব্য বিনোদন, রাজনীতি ও সামাজিক আলোচনার মধ্যকার সূক্ষ্ম সীমারেখাগুলোকে স্পর্শ করে। উত্তপ্ত সময়ের মধ্যেও রহমানের সংযত উপস্থিতি অনেক দর্শকের কাছে স্বস্তির বার্তা হয়ে আসলেও এই বিতর্কের দাবানল যে এখনই থামবে না, তা বেশ বোঝা যাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *