গণআওয়াজ ডেস্ক
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও মোহন ভাগবতের হুঙ্কার: বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে ভারতের চাল কী?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে এখন টানটান উত্তেজনা। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে শুধু ঢাকা নয়, দিল্লির মসনদেও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। একদিকে ভারতের হিন্দু পুনরুত্থানবাদী সংগঠন আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের ‘লড়াই ও ঐক্যের’ ডাক, অন্যদিকে দেড় দশক পর আওয়ামী লীগহীন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি ভারত। সীমান্তের ওপারে ক্ষমতার রদবদল ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে চলছে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক চর্চা। আজকের বিশ্লেষণে আমরা খতিয়ে দেখব কেন বাংলাদেশের ‘সোয়া এক কোটি’ হিন্দুকে একজোট হওয়ার পরামর্শ দিলেন ভাগবত এবং কেন এই নির্বাচন দিল্লির কাছে অস্তিত্বের লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুম্বাইয়ের এক অনুষ্ঠানে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের বক্তব্য বাংলাদেশের সংখ্যালঘু রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, বাংলাদেশের হিন্দুরা এবার আর পালিয়ে না গিয়ে থেকে যাওয়ার এবং লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভাগবতের মতে, এই ‘সোয়া এক কোটি’ হিন্দু যদি ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, তবে তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরকে নিজেদের নিরাপত্তার অনুকূলে ব্যবহার করতে পারবে। তবে বিষয়টি কেবল পরামর্শেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে ভারতসহ বিশ্বের হিন্দুরা তাদের পাশে থাকবে। এই বক্তব্যকে বিশ্লেষকরা দেখছেন নির্বাচনের আগে হিন্দুদের একটি ‘পলিটিক্যাল ব্লক’ হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা হিসেবে। বিশেষ করে ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর হিন্দুদের ওপর কথিত হামলার যেসব অভিযোগ ভারত তুলে আসছে, ভাগবতের এই বার্তা সেই অবস্থানকেই আরও শক্তিশালী করছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর প্রায় ২,৯০০টিরও বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। যদিও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই দাবি নাকচ করে একে অতিরঞ্জিত এবং ভারতের নিজস্ব সংখ্যালঘু সমস্যার দিক থেকে নজর সরানোর চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছে। তবে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের গ্রেফতারি বা পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ভারতের আরএসএস, বিজেপি ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের রাজপথে আন্দোলন প্রমাণ করে যে, দিল্লির জন্য ‘সংখ্যালঘু সুরক্ষা’ এখন একটি বড় কূটনৈতিক হাতিয়ার। ভাগবতের বক্তব্যে অনুপ্রবেশ ঠেকানো এবং জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষার যে তাগিদ দেওয়া হয়েছে, তা সরাসরি পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা সংশোধন ও এসআইআর প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত, যা বাংলাদেশের জন্য একটি অস্বস্তিকর ইঙ্গিত।
নির্বাচনী সমীকরণের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারত এখন আর কেবল আওয়ামী লীগের ওপর বাজি ধরছে না। দিল্লির কূটনৈতিক পাড়ায় কান পাতলে শোনা যাচ্ছে, তারা এখন ‘আওয়ামী লীগ-পরবর্তী’ বাস্তবতার জন্য মানসিক প্রস্তুতি সেরে ফেলেছে। বিশ্লেষক ড. শ্রীপর্ণা পাঠকের মতে, ভারতের কাছে এখন বিএনপি হলো ‘মন্দের ভালো’ অপশন। গত দেড় বছরে বিএনপির ভারত-বিরোধী অবস্থানে কিছুটা নমনীয়তা এবং ২০২৫ সাল থেকে জামায়াতের সাথে তাদের দূরত্ব বাড়ানোর কৌশল দিল্লিকে আশ্বস্ত করেছে। এমনকি খালেদা জিয়ার অসুস্থতার সময় প্রধানমন্ত্রী মোদীর টুইট বা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে ভারতীয় কর্মকর্তাদের যোগাযোগ প্রমাণ করে যে, দীর্ঘদিনের বৈরিতা কাটিয়ে একটি ‘ওয়ার্কিং রিলেশনশিপ’ গড়ার চেষ্টা চলছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো জামায়াতে ইসলামীর সাথে ভারতের গোপন যোগাযোগ। একসময় যে দলটিকে ভারত ‘রেড লাইন’ হিসেবে গণ্য করত, এখন সেই জামায়াতের আমিরের সাথে ভারতীয় কূটনীতিকদের সৌজন্য সাক্ষাতের খবর চাউর হয়েছে। সাবেক হাই কমিশনার রিভা গাঙ্গুলি দাসের মতে, প্রতিবেশীকে যেহেতু বদলানো সম্ভব নয়, তাই যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ভারতের জন্য প্রধান শর্ত হলো ‘নিরাপত্তা’। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো যাতে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করতে না পারে, সে বিষয়ে কোনো আপোষ করবে না দিল্লি। ভারত এখন শিলিগুড়ি থেকে মিজোরাম পর্যন্ত যে সামরিক অবকাঠামো তৈরি করেছে, তাতে নিরাপত্তার প্রশ্নে তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন তাই কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি ভারতের জন্য একটি লিটমাস টেস্ট। ভারত চাইছে একটি স্থিতিশীল এবং প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার, যারা অন্তত ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো গুরুত্বের সাথে দেখবে। মোহন ভাগবতের হিন্দুদের প্রতি ঐক্যের ডাক মূলত সেই স্থিতিশীলতার লড়াইয়ে একটি বাড়তি চাপের কৌশল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। তবে দিনশেষে, বাংলাদেশের ভোটারদের রায় এবং নতুন সরকারের দিল্লি-নীতিই নির্ধারণ করবে দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কের গতিপথ।
আপনি কি মনে করেন? কমেন্টে জানান!
