ক্রিকেট বয়কট আর চীনের সাথে ড্রোন চুক্তি: ডাউনিং স্ট্রিট নয়, নজর এখন ঢাকা-দিল্লি-বেইজিং ত্রিভুজ প্রেমে!

শেয়ার করুন

গণআওয়াজ ডেস্ক

হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে চীনের ‘মাস্টারস্ট্রোক’, ২০২৬-এর নির্বাচন ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি, ঢাকা-দিল্লি শীতলতা আর বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব

দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যে এক নতুন মেরুকরণের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ পরিবর্তনের এক বড় ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে ঢাকা ও দিল্লির দীর্ঘ ১৫ বছরের ‘মধুর’ সম্পর্কে যে ফাটল ধরেছে, সেই শূন্যস্থান পূরণে এখন সবচেয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে চীন। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে চীনের দিকে ঝোঁকার প্রবণতা আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন এখন প্রকাশ্য। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লিতে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া এবং তাঁকে প্রত্যর্পণের অনুরোধে সাড়া না দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। দিল্লির বিরুদ্ধে ঢাকার অন্যতম অভিযোগ হলো, ভারতে বসে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যা দেশের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করতে পারে। এই রাজনৈতিক তিক্ততা এখন আর কেবল কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে খেলার মাঠ থেকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে দুই দেশের উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। আইপিএল থেকে বাংলাদেশি বোলার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়া এবং এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের আইপিএল সম্প্রচার নিষিদ্ধ করা ও বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত দুই দেশের শীতল সম্পর্কের এক চরম বহিঃপ্রকাশ। এর পাশাপাশি ভিসা প্রদান ও সীমান্ত সমস্যা নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘ভারতবিরোধী’ মনোভাবকে আরও উসকে দিয়েছে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েই বেইজিং তার কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা তৎপরতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

চীনের এই কৌশলী অবস্থানের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো অতি সম্প্রতি স্বাক্ষরিত প্রতিরক্ষা চুক্তি। ভারতের সীমান্তের কাছাকাছি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে একটি ড্রোন তৈরির কারখানা স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং, যা দিল্লির নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দল বিএনপি, জামায়াত এবং নব্য গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করতে দেখা যাচ্ছে। বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্প এবং অর্থনৈতিক প্রণোদনার মাধ্যমে চীন নিজেকে একটি ‘নির্ভরযোগ্য সহযোগী’ হিসেবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।

অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানেও চীনের আধিপত্য স্পষ্ট। প্রতি বছর প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের মাধ্যমে চীন ইতিমধ্যে বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে। শেখ হাসিনার আমলে ভারতের আদানি গ্রুপসহ বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে আধিপত্য বিস্তার করলেও বর্তমানে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। হাসিনাপরবর্তী সময়ে নতুন কোনো বড় ভারতীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত না হলেও শত শত মিলিয়ন ডলারের চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বাণিজ্য নীতি এবং ট্রাম্পের সম্ভাব্য শুল্ক যুদ্ধের মুখে চীন নিজেকে বাংলাদেশের জন্য আরও বেশি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে।

তবে প্রশ্ন উঠছে, চীনপন্থী হওয়ার অর্থ কি ভারতকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা? বিশ্লেষকদের মতে, এটি সম্ভব নয়। ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ভারতবেষ্টিত। বাণিজ্য, ট্রানজিট, বিদ্যুৎ এবং কাঁচামাল আমদানির জন্য ভারতের ওপর নির্ভরতা এখনো অনেক বেশি। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের প্রয়োজনীয় সুতা এবং বিদ্যুতের একটি বড় অংশ ভারত থেকে আসে। দিল্লিও ভালো করেই জানে যে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর (সেভেন সিস্টার্স) নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকার সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক রাখা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক।

নির্বাচনী মাঠে এগিয়ে থাকা বিএনপি ও তার মিত্ররা এখন পর্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির কথা বলছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ‘দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়, সবার আগে বাংলাদেশ’—এই স্লোগানটি মূলত জনগণের সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক রাজনৈতিক কৌশল। বিএনপি ও জামায়াতের মতো দলগুলো ঐতিহাসিকভাবে ভারতের প্রতি শীতল মনোভাব পোষণ করলেও ক্ষমতায় যাওয়ার পথে তারা ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করছে না। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফর এবং তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ ইঙ্গিত দেয় যে, দিল্লিও এখন আওয়ামী লীগবিহীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর যে সরকারই আসুক না কেন, তাদের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে ভারত ও চীনের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা। চীনের অর্থনৈতিক প্রণোদনা এবং ভারতের ভৌগোলিক নৈকট্য—উভয়কেই বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে হবে। বর্তমান উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় এবং ক্রিকেট নিয়ে উত্তেজনা সাময়িক হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে পুনরায় বিশ্বাস স্থাপন জরুরি। অন্যথায়, বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে ঢাকাকে দিল্লির বলয় থেকে চিরতরে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।

বাংলাদেশের আগামী সরকার কি পারবে ভারত ও চীনের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রেখে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে? আপনার কী মনে হয়? কমেন্টে জানান!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *