২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯.১৩ শতাংশে পৌঁছেছে। গত ১০ মাসের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ রেকর্ড। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.৩০ শতাংশ ছাড়াল।
বাজার করতে গিয়ে কি পকেট খালি হয়ে যাচ্ছে? আপনি একা নন! বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) সর্বশেষ চাঞ্চল্যকর তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এতটাই বেড়েছে যা গত ৯ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। একদিকে আকাশচুম্বী খাদ্য মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে আয়ের তুলনায় ব্যয়ের বিশাল ফারাক—মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য এটি কি তবে এক মহাবিপদ সংকেত? বিস্তারিত জানুন।
নয় মাস পর মূল্যস্ফীতি আবার ৯ শতাংশের ঘরে: মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস
দেশের অর্থনৈতিক আকাশে কালো মেঘ আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
গত দশ মাসের সব রেকর্ড ভেঙে ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯.১৩ শতাংশে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) সবশেষ তথ্য বলছে, এটি গত বছরের এপ্রিল মাসের পর সর্বোচ্চ হার।
মাত্র এক মাসের ব্যবধানে জানুয়ারি মাসের ৮.৫৮ শতাংশ থেকে লাফিয়ে এই উচ্চতায় পৌঁছানোয় সীমিত আয়ের মানুষের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকেছে।
বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.৩০ শতাংশে পৌঁছানোয় রান্নাঘরের বাজার এখন সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে।
টানা চার মাস ধরে এই ঊর্ধ্বগতি প্রমাণ করছে যে, বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপগুলো এখনও আলোর মুখ দেখেনি।
মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে বিপন্ন জীবন: রেকর্ড ভাঙা ফেব্রুয়ারির পরিসংখ্যান
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) আজ রোববার মূল্যস্ফীতির যে চিত্র প্রকাশ করেছে, তা রীতিমতো উদ্বেগজনক।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯.১৩ শতাংশ হওয়ার মানে হলো, গত নয় মাস পর দেশ আবার নয় শতাংশের উচ্চ মূল্যস্ফীতির বৃত্তে প্রবেশ করল।
এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.০৫ শতাংশ।
তবে এবারের রেকর্ডটি আরও ভয়াবহ, কারণ এটি এপ্রিল ২০২৫-এর (৯.১৭%) পর সর্বোচ্চ।
খাদ্যপণ্যের লাগামহীন দাম:
ফেব্রুয়ারি মাসের এই মুদ্রাস্ফীতির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল খাদ্যপণ্য।
বিবিএসের হিসাব অনুযায়ী, খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.৩০ শতাংশে।
এটি টানা পাঁচ মাস ধরে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অন্যদিকে, খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিও পিছিয়ে নেই, যা বর্তমানে ৯.০১ শতাংশ।
রমজানকে সামনে রেখে বাজারে এই বাড়তি চাপ জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।
সাধারণ মানুষ বলছেন, আয়ের চেয়ে ব্যয় বৃদ্ধির গতি কয়েক গুণ বেশি।
মজুরি বনাম মূল্যস্ফীতি: বিস্তর ফারাক
বিবিএস বলছে, ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.০৬ শতাংশ।
কিন্তু যেখানে মূল্যস্ফীতি ৯.১৩ শতাংশ, সেখানে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় মূলত কমে গেছে।
এর সহজ অর্থ হলো, মানুষ গত বছর যে পণ্য ১০০ টাকায় কিনতে পারত, এখন তার জন্য ১০৯ টাকা ১৩ পয়সা খরচ করতে হচ্ছে।
কিন্তু সেই অনুপাতে পকেটে টাকা বাড়ছে না।
ফলে জীবনযাত্রার মান কমিয়ে বা সঞ্চয় ভেঙে চলতে হচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে।
অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ ও আস্থার সংকট:
রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) এক সেমিনারে অর্থনীতিবিদরা বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘বড় চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক মনে করেন, সরকারের প্রতি মানুষের আস্থার ঘাটতি মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি বা নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে একধরনের ‘প্যানিক বায়িং’ দেখা যাচ্ছে, যা বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই প্রকাশ করে।
সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখা এবং বাজার তদারকি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
সমাধানের পথ কী?
সেমিনারে বক্তারা বলেন, শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব নয়; এর জন্য রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং ব্যবসা সহজীকরণে ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ সত্যিকার অর্থে কার্যকর করতে হবে।
সরবরাহ চেইনে কোনো ধরনের বাধা যেন না থাকে, তা নিশ্চিত করা ছাড়া এই আগুনের উত্তাপ কমানো অসম্ভব।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জুনায়েদ আবদুর রহিম সাকি জানিয়েছেন, সরকার বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন ও পুঁজিবাজার পুনর্গঠনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
তবে সাধারণ মানুষের চাওয়া একটাই—পরিসংখ্যানের উন্নতির চেয়েও যেন বাজারের থলেতে স্বস্তি ফিরে আসে।
মূল্যস্ফীতি এখন কেবল একটি অর্থনৈতিক পরিভাষা নয়, এটি সাধারণ মানুষের যন্ত্রণার নাম।
টানা চার মাসের বৃদ্ধি এবং ফেব্রুয়ারির ৯.১৩ শতাংশ হার বুঝিয়ে দিচ্ছে যে অর্থনীতি একটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বগতি আপনার দৈনন্দিন জীবনে কেমন প্রভাব ফেলছে?
আমাদের কমেন্ট সেকশনে জানান এবং বাজার স্থিতিশীল করতে আপনার পরামর্শ শেয়ার করুন।
