ক্রীড়া প্রতিবেদক | গণ আওয়াজ
দেশের ক্রিকেট বোর্ডকে রাজনীতি, প্রভাব ও দলীয় করণের নগ্ন থাবা থেকে মুক্ত করার যে দীর্ঘদিনের গণদাবি ছিল, তা আবারও নির্মমভাবে ধামাচাপা দেওয়া হলো। দেশের সবচেয়ে ধনী ও প্রভাবশালী ক্রীড়া সংস্থা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নতুন কার্যনির্বাহী কমিটির যে চিত্র সামনে এসেছে, তাতে স্পষ্ট মেধা, পারফরম্যান্স বা যোগ্য ক্রীড়া সংগঠকের কোনো স্থান এখানে নেই। সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও দলীয় নীতি-নির্ধারকদের ছেলে, ভাই আর নিকটাত্মীয়দের দিয়ে সাজানো হয়েছে নতুন এই ২৪ তাসের তাসের ঘর।
যদিও সাবেক সফল অধিনায়ক তামিম ইকবাল নির্বাচিত পরিচালকদের ভোটে একক প্রার্থী হিসেবে বিসিবির নতুন সভাপতি হয়েছেন, তবে মাঠের ক্রিকেটকে ভালোবেসে সাধারণ মানুষ যে আমূল পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছিল, তা শুরুতেই বড় ধাক্কা খেল। ক্রিকেটপ্রেমীদের প্রশ্ন একঝাঁক দলীয় ক্যাডার আর মন্ত্রীর সন্তানদের বেষ্টনীতে থেকে তামিম কি আদৌ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন, নাকি তাকে কেবল একটি ‘পাবলিক ফেস’ বা মুখোশ হিসেবে ব্যবহার করে আড়ালে ক্ষমতার কলকাঠি নাড়বে এই রাজনৈতিক সিন্ডিকেট?
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিসিবির নতুন এই নীতিনির্ধারক পর্ষদ আগামী ৪ বছরের জন্য দায়িত্ব পেয়েছে। ২৫ সদস্যের এই বোর্ডের একমাত্র সহসভাপতি করা হয়েছে আবাহনী ক্লাবের ফাহিম সিনহাকে। তবে পুরো বোর্ডের দিকে তাকালে খেলার চেয়ে রাজনীতির মাঠেরই বেশি প্রতিফলন দেখা যায়:
১. ক্লাব ক্যাটাগরি:
বিসিবির পরিচালনা পর্ষদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী অংশ হলো ঢাকা ক্লাব ক্যাটাগরি (১২ জন)। এখানে সরাসরি রাজত্ব কায়েম করেছেন বর্তমান সরকারের শীর্ষ মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যদের সন্তানেরা:
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুত্র: ফেয়ার ফাইটার্স ক্লাবের কাউন্সিলর সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ (৭২ ভোট)। তিনি বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ছেলে।
অর্থমন্ত্রীর পুত্র: এক্সিউম ক্লাবের কাউন্সিলর ইসরাফিল খসরু (৭২ ভোট)। তিনি বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ছেলে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টার পুত্র: আজাদ স্পোর্টিংয়ের কাউন্সিলর ইয়াসির আব্বাস। তাঁর বাবা ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস।
সংসদ সদস্যদের সন্তানদের দাপট: শাইনপুকুর ক্লাবের আসিফ রব্বানি (বগুড়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম সিরাজের ছেলে) এবং বসুন্ধরা রাইডার্সের মির্জা ইয়াসির (কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামের ছেলে) পরিচালকের চেয়ার পেয়েছেন।
২. জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়:
জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের নির্বাচনেও ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও কোথাও নামমাত্র ভোটের নাটক হয়েছে:
স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর ভাই: রংপুর বিভাগ থেকে পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন ফয়সল আমীন, যিনি বর্তমান স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তথা দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের আপন ভাই।
বিমানমন্ত্রীর পুত্র: ঢাকা বিভাগ থেকে কোনো ভোট ছাড়াই, অর্থাৎ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সরাসরি পরিচালক হয়েছেন সাইদ বিন জামান বিমান। তিনি বর্তমান বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাতের ছেলে।
প্রতিমন্ত্রীর ভাই ও পুত্র: খুলনা বিভাগে বিজয়ী হয়েছেন শান্তনু ইসলাম, যিনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলামের ভাই। অন্যদিকে রাজশাহী বিভাগ থেকে পরিচালক হওয়া মীর শাকরুল আলম হলেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর মীর শাহে আলমের ছেলে।
মন্ত্রীর চাচা: চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে পরিচালক হয়েছেন মঈন উদ্দিন চৌধুরী, যিনি বর্তমান পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরীর আপন চাচা।
তবে এই রাজনৈতিক বলয়ের মাঝে একমাত্র আশার আলো সাবেক জাতীয় অধিনায়ক ও প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, যিনি চট্টগ্রাম বিভাগ থেকে পরিচালক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।
৩. সরকারি কোটা ও পুরষ্কারের রাজনীতি:
সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপের জায়গা হলো জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) থেকে মনোনীত ২ জন পরিচালক। সেখানেও ব্যবসায়ী এবং দলের ট্রাস্টের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করা হয়েছে। মনোনীত পরিচালক সরফরাজ আহমেদ মূলত আরাফাত রহমান কোকো ট্রাস্টের কোঅর্ডিনেটর।
যখন দেশের ক্রিকেট অবকাঠামো ধ্বংসের মুখে, ঘরোয়া লিগে আম্পায়ারিং নিয়ে বিতর্ক নিত্যদিনের ঘটনা, আর আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশ দল ধারাবাহিক ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তখন বিসিবিকে রাজনৈতিক পুনর্বাসন কেন্দ্র বা ক্ষমতার বৃত্তে থাকা পরিবারগুলোর নতুন ‘খেলার মাঠ’ বানিয়ে ফেলার এই সংস্কৃতি অত্যন্ত বিপজ্জনক।
বোর্ডের নীতি-নির্ধারণী চেয়ারে যখন ক্রীড়া মনস্তত্ত্ব বা ক্রিকেটীয় দক্ষতার চেয়ে ‘রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট’ বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন মাঠের ক্রিকেট এবং অভ্যন্তরীণ সুশাসন বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য। তামিম ইকবালের মতো একজন ক্রিকেট আইকনকে সামনে রেখে আড়ালে এই রাজনৈতিক সিন্ডিকেট দেশের ক্রিকেটকে কোন অতল গহ্বরে নিয়ে যায়, সেটাই এখন সাধারণ জনগণের বড় উদ্বেগ।
