আন্তর্জাতিক সংকট ও ক্রমবর্ধমান লোকসানের মুখে দেশে আবারও বাড়ল জ্বালানি তেলের দাম

শেয়ার করুন

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এসে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের মুখে দেশে জ্বালানি তেলের দাম পুনরায় একলাফে রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেল, অক্টেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম এক ধাক্কায় ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে বর্তমানে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১৩৫ টাকায়, অক্টেন ১৬৫ টাকায়, পেট্রোল ১৬০ টাকায় এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকায়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বৈশ্বিক সংকট পরিস্থিতির অজুহাতে এই মূল্যবৃদ্ধি দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

চলতি ২০২৬ সালে জ্বালানি তেলের মূল্যে ধারাবাহিক সমন্বয় ও বৃদ্ধির প্রক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়েছে। বছরের শুরুতে অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি মাসে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ছিল ১০০ টাকা, অক্টেন ১২০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং কেরোসিন ছিল ১১২ টাকা। তবে এপ্রিল মাসে প্রথম দফায় বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়ে ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয় এবং অন্যান্য তেলের দাম সর্বোচ্চ ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়। পরবর্তীতে জুন মাসের ১ তারিখে দ্বিতীয় দফায় সমন্বয় করে অক্টেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম আরও ৫ টাকা বাড়ানো হলেও ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। সর্বশেষ ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকরের মাধ্যমে চলতি বছরে তৃতীয়বারের মতো পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম এক লাফে সর্বোচ্চ ২০ টাকা বাড়িয়ে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ এই রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির পেছনে প্রধান প্রেক্ষাপট হিসেবে সরকার আন্তর্জাতিক বাজারের অনিয়ন্ত্রিত ঊর্ধ্বগতি ও বিপণনকারী সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) অসামাল লোকসানকে দায়ী করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও বিশ্বজুড়ে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। বিগত মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত টানা পাঁচ মাস আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও দেশীয় বাজারে দাম অপরিবর্তিত রাখতে গিয়ে বিপিসিকে প্রায় ২২,৮৭৫ কোটি টাকারও বেশি লোকসান গুণতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক মূল্যের সাথে সমন্বয় না করলে প্রতিদিন প্রায় ১০৯ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছিল এবং পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে তেলের দাম কম থাকায় পাচারের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছিল।

জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির সরাসরি খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ ও স্বল্প আয়ের ব্যবসায়ীদের। বাংলাদেশে ব্যবহৃত মোট জ্বালানি তেলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ডিজেল, যা গণপরিবহন, পণ্যবাহী পরিবহন, কৃষিভিত্তিক সেচ ব্যবস্থা এবং শিল্পকারখানার উৎপাদনে সরাসরি ব্যবহৃত হয়। তেলের দাম বাড়ায় ট্রাক ও বাস ভাড়া বৃদ্ধি পাবে, যা সরাসরি নিত্যপ্রয়োজনীয় চাল, ডাল, শাকসবজিসহ সাধারণ পণ্যের বাজার দরকে আরও উস্কে দেবে। ডলার সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির এই কঠিন সময়ে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি জীবনযাত্রার ব্যয়কে কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দিয়ে জনজীবনে চরম সংকট তৈরি করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *