আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পঞ্চগড়-১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। নির্বাচনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তিনি নির্বাচন কমিশনে হলফনামা জমা দিয়েছেন। তবে ওই হলফনামা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে দাখিল করা তার আয়কর রিটার্ন পর্যালোচনা করে আয়ের তথ্য ও সম্পদের হিসাব নিয়ে একাধিক অসঙ্গতি সামনে এসেছে, যা নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
আয়ের তথ্যেই বড় ব্যবধান
২৭ বছর বয়সী সারজিস আলম হলফনামায় নিজের পেশা উল্লেখ করেছেন ‘ব্যবসায়ী’ হিসেবে। সেখানে তার বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৯ লাখ টাকা। কিন্তু ২০২৫–২৬ অর্থবছরের আয়কর রিটার্নে তার বার্ষিক আয় উল্লেখ করা হয়েছে ২৮ লাখ ৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ দুটি সরকারি নথিতে প্রদত্ত আয়ের পরিমাণের মধ্যে প্রায় তিনগুণেরও বেশি পার্থক্য রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনী হলফনামা ও আয়কর রিটার্ন—এই দুই নথিই রাষ্ট্রীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ দলিল। কোনো প্রার্থীর আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছতা যাচাইয়ে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে একই ব্যক্তির আয়ের হিসাব যদি দুই নথিতে ভিন্নভাবে উপস্থাপিত হয়, তাহলে তা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়।
সম্পদের হিসাবেও ভিন্ন চিত্র
আয়ের মতো সম্পদের ক্ষেত্রেও ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী সারজিস আলমের মোট সম্পদের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ৩৩ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। অথচ নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় তার সম্পদের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম দেখানো হয়েছে।
হলফনামার তথ্যমতে, তার অস্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে নগদ অর্থ ৩ লাখ ১১ হাজার ১২৮ টাকা এবং ব্যাংকে জমা এক লাখ টাকা। এ ছাড়া ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও আসবাবপত্রের মূল্য যথাক্রমে ৭৫ হাজার টাকা করে দেখানো হয়েছে। হলফনামায় স্বর্ণালংকার থাকার কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
স্থাবর সম্পদের অংশে দেখা যায়, তিনি দানের মাধ্যমে পাওয়া সাড়ে ১৬ শতাংশ কৃষিজমির মালিক। ওই জমির অর্জনকালীন মূল্য উল্লেখ করা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার টাকা, তবে বর্তমানে এর আনুমানিক বাজারমূল্য ধরা হয়েছে ৫ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে হলফনামা অনুযায়ী তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১০ লাখ টাকা।
স্বচ্ছতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে
একজন সংসদ প্রার্থীর ক্ষেত্রে আয় ও সম্পদের তথ্যের স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। নির্বাচনী হলফনামা ভোটারদের সামনে প্রার্থীর আর্থিক অবস্থার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরার জন্যই বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একইভাবে আয়কর রিটার্ন রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের প্রকৃত আয়ের হিসাব দেয়ার একটি আইনি নথি।
এই দুই নথির মধ্যে বড় ধরনের অমিল থাকলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—কোন তথ্যটি প্রকৃত বাস্তবতার কাছাকাছি? আয়ের প্রকৃত পরিমাণ কত? সম্পদের পূর্ণাঙ্গ হিসাব কি যথাযথভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে?
আইন ও নৈতিকতার প্রশ্ন
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী, হলফনামায় মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একইভাবে আয়কর নথিতে ভুল বা অসত্য তথ্য উপস্থাপনও আইনগত জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক বিতর্কেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আইনগত ও নৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকদের কাছ থেকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রত্যাশা আরও বেশি। সে কারণে একজন তরুণ রাজনৈতিক নেতার আর্থিক নথিতে এমন অমিল সামনে এলে তা জনমনে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে।
অপেক্ষা ব্যাখ্যার
সারজিস আলম বা তার দলের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা এলে প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হতে পারে। আয়ের উৎস, সম্পদের মূল্যায়ন কিংবা হিসাবের পার্থক্যের কারণ ব্যাখ্যা করা হলে বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে আপাতত হলফনামা ও আয়কর রিটার্নে উল্লেখিত ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পঞ্চগড়-১ আসনের এই সম্ভাব্য প্রার্থীর আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, যা নির্বাচনের আগে আরও গুরুত্ব পেতে পারে।
