একটা সময় ছিল, বাংলাদেশে “মধ্যবিত্ত” শব্দটার একটা ওজন ছিল।
এই শ্রেণি মানেই ছিল—শিক্ষা, শালীনতা, পরিশ্রম আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। আজ সেই মধ্যবিত্তই সবচেয়ে নীরব, সবচেয়ে ক্লান্ত, সবচেয়ে অনিশ্চিত শ্রেণি। প্রশ্ন হচ্ছে—এই উধাও হয়ে যাওয়া কি কেবল অর্থনৈতিক দুর্ঘটনা, নাকি দীর্ঘদিনের নীতিনির্ধারিত বাস্তবতা?
আজকের মধ্যবিত্ত আর দারিদ্র্যের মাঝখানে কোনো শক্ত দেয়াল নেই। একদিকে আয় স্থির, অন্যদিকে খরচ ছুটছে ঘোড়ার মতো। বাজারে গেলে সেটা বোঝা যায়, হাসপাতালের বিল এলে সেটা বোঝা যায়, সন্তানের স্কুল ফি জমা দিতে গিয়ে সেটা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়। অথচ কাগজে-কলমে দেশ “উন্নয়নের পথে”।
মধ্যবিত্তের সংকটটা সবচেয়ে ভয়ংকর কারণ—এটা চিৎকার করে না।
এই শ্রেণি রাস্তায় নামে না, লুটপাট করে না, ক্ষমতার দরজায় ধাক্কা দেয় না। তারা চুপচাপ মানিয়ে নিতে শেখে। কম খায়, কম পরে, কম স্বপ্ন দেখে। জীবনযাত্রার মান নামিয়ে আনে, কিন্তু মর্যাদার কথা বলে না। এই নীরবতাই তাদের দুর্বলতা—এবং ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক।
এক সময় যে পরিবার বছরে একবার গ্রামের বাড়ি যেত, এখন সেটা বিলাস। যে পরিবার সন্তানের জন্য ভালো কোচিং ভাবত, এখন “যা আছে তাই যথেষ্ট” বলে নিজেকে বোঝায়। চিকিৎসা মানে এখন প্রাইভেট হাসপাতাল নয়, “আরো একটু সহ্য করা যাক”। মধ্যবিত্তের জীবনে এই “সহ্য করা” শব্দটাই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই সংকট কি শুধু বাজারের কারণে? না।
এটা সিদ্ধান্তের ফল। নীতির ফল। অগ্রাধিকারের ফল।
যখন অর্থনৈতিক নীতিতে বড় কর্পোরেট, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী বা উচ্চবিত্তের সুবিধা বারবার অগ্রাধিকার পায়, তখন চাপটা গিয়ে পড়ে মধ্যবিত্তের ঘাড়ে। কর কাঠামো, শিক্ষা ব্যয়, স্বাস্থ্য খরচ, পরিবহন—সবকিছুতেই মধ্যবিত্ত সবচেয়ে বেশি দেয়, কিন্তু সবচেয়ে কম পায়। গরিব কিছুটা সহায়তা পায়, ধনী নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নেয়—মাঝখানে যে শ্রেণি, তারা পড়ে থাকে অনিশ্চয়তায়।
মধ্যবিত্ত ভাঙলে সমাজ ভাঙে—এটা নতুন কোনো তত্ত্ব নয়।
এই শ্রেণিই সমাজে স্থিতিশীলতা আনে, চরমপন্থা ঠেকায়, প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখে। মধ্যবিত্ত দুর্বল হলে সমাজ হয় দুই মেরুর—একদিকে অল্প কিছু সুবিধাভোগী, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক বঞ্চিত মানুষ। মাঝখানের সেতুটা ভেঙে গেলে রাষ্ট্রের ভারসাম্যও নষ্ট হয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—এই প্রক্রিয়াটা ধীরে ধীরে ঘটছে।
কোনো একদিন সকালে উঠে কেউ দেখেনি যে সে মধ্যবিত্ত থেকে নেমে গেছে। এটা মাসে মাসে, বছরে বছরে ঘটে। একটু একটু করে। ঠিক যেমন পানি ফুটতে থাকা হাঁড়ির মধ্যে ব্যাঙ টের পায় না।
প্রশ্ন হচ্ছে—এ থেকে বেরোনোর পথ কী?
প্রথমত, মধ্যবিত্তকে আবার নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে আনতে হবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন—এই তিন জায়গায় মধ্যবিত্তবান্ধব সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনো উন্নয়ন টেকসই হয় না। দ্বিতীয়ত, এই শ্রেণির নীরবতাকে ভাঙতে হবে। তারা যদি নিজেদের সংকট নিজেই না বলে, তাহলে কেউ এসে বলবে না।
মধ্যবিত্ত উধাও হওয়া মানে শুধু একটি শ্রেণির পতন নয়—এটা ভবিষ্যতের সংকেত।
প্রশ্নটা তাই আর “কে উন্নয়ন পেল” নয়, প্রশ্নটা এখন—কে বাদ পড়ল?
আর সেই বাদ পড়াদের তালিকার শীর্ষে যদি মধ্যবিত্তই থাকে, তাহলে এটা দুর্ঘটনা নয়।
এটা পরিকল্পনা না হলেও, দীর্ঘদিনের অবহেলার স্বাভাবিক ফল।
