স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা, রাজপথ থেকে রাষ্ট্রগঠন: ইতিহাসের এক অধ্যায়ের নাম তোফায়েল আহমেদ

শেয়ার করুন

অবশেষে নিভে গেল স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোর এক উজ্জ্বল প্রদীপ। থেমে গেল সেই কণ্ঠ, যে কণ্ঠ একদিন রাজপথে উচ্চারণ করেছিল বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। বিদায় নিলেন বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক তোফায়েল আহমেদ। তাঁর প্রয়াণ শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার মৃত্যু নয়; এটি বাংলাদেশের সংগ্রামী ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়ের সমাপ্তি।

আজকের বাংলাদেশে রাজনীতি যখন প্রায়শই আদর্শহীন ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় পর্যবসিত, তখন তোফায়েল আহমেদের জীবন আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই সময়টিতে, যখন রাজনীতি মানে ছিল সংগ্রাম, ত্যাগ এবং জাতির মুক্তির জন্য আত্মনিবেদন। যে প্রজন্ম কারাগারকে ভয় পেত না, রাজপথকে ভালোবাসত এবং জনগণের অধিকারকে ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিত তোফায়েল আহমেদ ছিলেন সেই প্রজন্মের অন্যতম উজ্জ্বল প্রতিনিধি।

১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মানুষটির রাজনৈতিক উত্থান কোনো পারিবারিক ঐতিহ্যের হাত ধরে হয়নি। তিনি উঠে এসেছিলেন জনগণের ভেতর থেকে, ছাত্রসমাজের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজপথেই তিনি নিজেকে নির্মাণ করেছিলেন একজন সংগ্রামী নেতা হিসেবে। ষাটের দশকের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর সরব উপস্থিতি তাঁকে পরিণত করেছিল বাঙালির অধিকার আদায়ের এক নির্ভরযোগ্য কণ্ঠে।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক টার্নিং পয়েন্ট। সেই আন্দোলনের অন্যতম স্থপতি ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে তিনি শুধু একটি আন্দোলন পরিচালনা করেননি; তিনি একটি জাতির রাজনৈতিক চেতনাকে জাগ্রত করতে ভূমিকা রেখেছিলেন। পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে যখন বাংলার মানুষ মুক্তির পথ খুঁজছিল, তখন ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ সেই পথের দিকনির্দেশকদের একজন হয়ে ওঠেন।

ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে আছে ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারির সেই বিকেল। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এটি ছিল শুধু একটি উপাধি প্রদান নয়; এটি ছিল একটি জাতির পক্ষ থেকে তার ভবিষ্যৎ নেতার প্রতি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। বাঙালির জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে তাঁর নাম তাই অবিচ্ছেদ্য।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি শুধু রাজনৈতিক ভাষণেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, মুজিব বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন, স্বাধীনতার পক্ষে জনমত সংগঠিত করেছেন। স্বাধীনতার লড়াইয়ে তাঁর অবদান প্রমাণ করে, তিনি কেবল বক্তৃতার নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন কর্মের মানুষ।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বঙ্গবন্ধুর নিকটতম সহযোগীদের একজন হিসেবে তিনি রাষ্ট্রগঠনের প্রথম দিনগুলোর প্রত্যক্ষ সাক্ষী। বাংলাদেশের জন্ম, সংগ্রাম এবং পুনর্গঠনের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিলেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে অন্ধকার নেমে আসে, সেই কঠিন সময়েও তিনি আপস করেননি। কারাবরণ করেছেন, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, কিন্তু আদর্শ ত্যাগ করেননি। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তাঁর অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে হয়তো যথেষ্ট আলোচিত নয়, কিন্তু ইতিহাস তার যথাযথ মূল্যায়ন একদিন করবেই।

আজ তোফায়েল আহমেদের বিদায়ের মুহূর্তে একটি প্রশ্ন সামনে আসে এই প্রজন্ম কি তাঁর মতো রাজনীতিবিদ তৈরি করতে পেরেছে? রাজনীতি কি এখনও জনগণের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম, নাকি তা কেবল ক্ষমতার সমীকরণে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে? তোফায়েল আহমেদের জীবন এই প্রশ্নগুলোর সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয়।

তিনি ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় কোনো পদ-পদবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ছিলেন একটি সময়ের প্রতিনিধি, একটি সংগ্রামের প্রতীক এবং একটি জাতির জাগরণের সাক্ষী। তাঁর মৃত্যুতে আওয়ামী লীগ একজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে হারিয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশ হারিয়েছে তার স্বাধীনতা সংগ্রামের এক জীবন্ত স্মৃতিচিহ্নকে।

মানুষ মরে যায়, ইতিহাস বেঁচে থাকে। আর কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা ইতিহাসের ভেতরেই নিজেদের স্থায়ী আসন তৈরি করে যান। তোফায়েল আহমেদ তেমনই একজন।

স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা, রাজপথ থেকে রাষ্ট্রগঠন বাংলাদেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে যার পদচিহ্ন অঙ্কিত, সেই সংগ্রামী নেতাকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা।

বিদায় তোফায়েল আহমেদ।

বিদায় বাঙালির সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *