সঙ্কটে স্টারমার, ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কি মুসলিম নারী শাবানা মাহমুদ

ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কি মুসলিম নারী শাবানা মাহমুদ?
শেয়ার করুন

গণআওয়াজ ডেস্ক

১০ ডাউনিং স্ট্রিটে কি প্রথম মুসলিম প্রধানমন্ত্রী? স্টারমার সরকারের পতন ঘণ্টা ও ইতিহাসের দ্বারপ্রান্তে ব্রিটেন ও কাশ্মীরের মেয়ে শাবানা মাহমুদ!

যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে এখন এক অস্থির সময় পার হচ্ছে। যে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে লেবার পার্টি ক্ষমতায় এসেছিল, সেই সরকারই এখন খাদের কিনারে। জেফরি এপস্টেইন কেলেঙ্কারির নতুন ফাইল প্রকাশ্যে আসার পর প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমারের নেতৃত্ব বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। লন্ডনের রাজনৈতিক অলিন্দে এখন একটাই গুঞ্জন—স্টারমার কি টিকতে পারবেন? আর যদি তিনি পদত্যাগ করেন, তবে কি পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত শাবানা মাহমুদ হতে যাচ্ছেন ব্রিটেনের প্রথম মুসলিম প্রধানমন্ত্রী?

সঙ্কটের মূলে রয়েছে দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সাথে স্টারমারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী পিটার ম্যান্ডেলসনের সম্পর্ক। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত নথিতে দেখা গেছে, ম্যান্ডেলসন ব্রিটিশ মন্ত্রী থাকাকালীন এপস্টেইনের কাছে গোপন সরকারি তথ্য পাচার করেছিলেন। এমনকি ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার সময়কার স্পর্শকাতর তথ্যও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর স্টারমারের ‘চিফ অফ স্টাফ’সহ একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন। স্কটিশ লেবার নেতা আনাস সারওয়ারের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা এখন প্রকাশ্যেই প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছেন।

কিয়ের স্টারমারের ১৯ মাসের প্রধানমন্ত্রিত্ব এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পের সম্মুখীন। যদিও স্টারমারের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত কোনো অনৈতিকতার অভিযোগ নেই, তবে ম্যান্ডেলসনকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটিই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নিয়োগের পেছনে যারা পরামর্শ দিয়েছিলেন, দায়ভার কাঁধে নিয়ে তারা একে একে সরে দাঁড়াচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের নিয়ন্ত্রণ এখন স্টারমারের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক সঙ্কটে জর্জরিত ব্রিটিশ জনগণের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢেলেছে এই এপস্টেইন বিতর্ক।

এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যেই সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম হিসেবে উঠে এসেছেন বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। লেবার পার্টির ভেতরে এবং বাইরে তাকে স্টারমারের উত্তরসূরি হিসেবে ভাবা হচ্ছে। যদি বর্তমান পরিস্থিতির চাপে স্টারমার সরে দাঁড়ান, তবে ব্রিটেনের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম এবং প্রথম এশীয় বংশোদ্ভূত নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস গড়বেন এই ৪৪ বছর বয়সী নেত্রী।

শাবানা মাহমুদের জন্ম ১৯৮০ সালে ব্রিটেনের বার্মিংহামে। তার শেকড় প্রোথিত পাকিস্তানের আজাদ কাশ্মীরের মিরপুরে। ষাটের দশকে তার পরিবার যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমায়। ছোটবেলার কিছুটা সময় সৌদি আরবে কাটলেও তার পড়াশোনা ও বেড়ে ওঠা ব্রিটেনেই। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লিংকন কলেজ থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক শেষ করে ২০০৩ সালে তিনি ব্যারিস্টার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তার এই আইনি ব্যাকগ্রাউন্ড তাকে রাজনৈতিক তর্কে এক অনন্য উচ্চতা দিয়েছে।

২০১০ সালে বার্মিংহাম লেডিউড আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে শাবানার সংসদীয় রাজনীতির সূচনা। তিনি ছিলেন যুক্তরাজ্যের প্রথম দিকের তিন মুসলিম নারী এমপির একজন। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শ্যাডো ক্যাবিনেটে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পর ২০২৪ সালে লেবার পার্টি ক্ষমতায় এলে তিনি ব্রিটেনের প্রথম মুসলিম নারী লর্ড চ্যান্সেলর এবং বিচারমন্ত্রী হন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (Home Secretary) দায়িত্ব দেওয়া হয়।

শাবানা মাহমুদ লেবার পার্টির ডানপন্থী বা কট্টরপন্থী ধারার নেতা হিসেবে পরিচিত। মজার বিষয় হলো, নিজে একজন অভিবাসী পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও অভিবাসন ইস্যুতে তার অবস্থান বেশ কঠোর। তিনি মনে করেন, অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন সমাজকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে।

কারাগারের ধারণক্ষমতা বাড়ানো এবং বিচারব্যবস্থার জট কাটাতে তার নেওয়া পদক্ষেপগুলো ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। এমনকি মানবাধিকার সুরক্ষার ইউরোপীয় কনভেনশন (ECHR) সংস্কারের পক্ষেও তিনি মত দিয়েছেন, যা সাধারণত রক্ষণশীলদের এজেন্ডা হিসেবে পরিচিত। তার এই ‘টাফ অন ক্রাইম’ এবং কঠোর অভিবাসন নীতি তাকে কনজারভেটিভ ভোটারদের কাছেও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে, যা তাকে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য একজন শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

শাবানা মাহমুদের রাজনৈতিক পথ মসৃণ ছিল না। তাকে একদিকে যেমন কট্টর ডানপন্থীদের ইসলামভীতি বা ইসলামোফোবিয়ার শিকার হতে হয়েছে, অন্যদিকে নিজের কমিউনিটির কট্টরপন্থীদের কাছ থেকেও সমালোচিত হতে হয়েছে। ২০১৩ সালে সমকামী বিয়ের পক্ষে ভোট দেওয়া এবং স্কুল পাঠ্যক্রমে LGBTQ+ অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে তার মন্তব্য রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। তবে তিনি সবসময়ই নিজের অবস্থানে অনড় থেকেছেন।

ফিলিস্তিন-ইসরায়েল ইস্যুতে শাবানা মাহমুদের অবস্থান ভারসাম্যপূর্ণ। তিনি গাজায় মানবিক পরিস্থিতির নিন্দা জানিয়েছেন এবং দুই রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে লেবার পার্টির দীর্ঘদিনের নীতিকে সমর্থন করেছেন। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, শাবানা যদি প্রধানমন্ত্রী হন, তবে তিনি ব্রিটেনের সামাজিক সংহতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে আরও কঠোর ভূমিকা পালন করবেন।

বর্তমানে ডাউনিং স্ট্রিট দাবি করছে যে, প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার কোথাও যাচ্ছেন না। কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, যখন দলের ভেতর থেকেই পদত্যাগের ডাক ওঠে, তখন টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। যদি ব্রিটিশ রাজনীতিতে কোনো নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে এবং লেবার পার্টি তাদের নেতৃত্ব বদলানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তবে শাবানা মাহমুদ হতে পারেন আধুনিক ব্রিটেনের জন্য এক নতুন সংজ্ঞার নেতৃত্ব।

আপনার কী মনে হয়? একজন অভিবাসী বংশোদ্ভূত কট্টরপন্থী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি পারবেন ব্রিটেনের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে? কমেন্টে জানান!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *