বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হলো আন্তর্জাতিক আদালতের সাম্প্রতিক রায়ের মাধ্যমে। সুনামগঞ্জের ছাতকে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে সংঘটিত ভয়াবহ বিস্ফোরণ মামলায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি কেন্দ্র (ICSID) বাংলাদেশের পক্ষে রায় দিয়েছে। এই রায়ে কানাডাভিত্তিক কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেস লিমিটেড-কে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সম্পাদনা নোট: এই লেখা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে পুনর্লিখিত ও বিশ্লেষণধর্মীভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি সরাসরি অনুলিপি নয়।
কত ক্ষতিপূরণ পেল বাংলাদেশ?
আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায় অনুযায়ী, নাইকোকে মোট ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। বাংলাদেশি মুদ্রায় (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ১৬ পয়সা হিসাবে) যার পরিমাণ প্রায় ৫১৩ কোটি টাকা।
ক্ষতিপূরণের খাতভিত্তিক বিবরণ অনুযায়ী—
- গ্যাসক্ষেত্র থেকে প্রায় ৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নষ্ট হওয়ার জন্য ৪০ মিলিয়ন ডলার
- পরিবেশগত ও অন্যান্য ক্ষতির জন্য অতিরিক্ত ২ মিলিয়ন ডলার
এই তথ্য গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান।
টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণ: কী ঘটেছিল?
২০০৩ সালে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের দায়িত্ব নাইকোর কাছে হস্তান্তর করা হয়। খনন কার্যক্রম শুরুর পর ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি এবং ২৪ জুন—দুটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।
এই বিস্ফোরণের ফলে—
- গ্যাসক্ষেত্রের মজুদ গ্যাস সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যায়
- আশপাশের স্থাপনা, কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়
- স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে
আইনি লড়াইয়ের দীর্ঘ পথচলা
বিস্ফোরণের পর পেট্রোবাংলা নাইকোর কাছে প্রায় ৭৪৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে। নাইকো সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে—
- ২০০৭ সালে স্থানীয় নিম্ন আদালতে মামলা করে পেট্রোবাংলা
- নাইকোর ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের গ্যাস বিল পরিশোধ বন্ধ রাখা হয়
- হাইকোর্ট নাইকোর বাংলাদেশে থাকা সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও চুক্তি বাতিলের নির্দেশ দেন
- সুপ্রিম কোর্টেও বাংলাদেশের পক্ষেই রায় বহাল থাকে
আইসিডিতে মামলা ও চূড়ান্ত রায়
২০১০ সালে নাইকো পেট্রোবাংলার বিরুদ্ধে আইসিডিতে দুটি মামলা করে। এর মধ্যে ২০১৪ সালের এক রায়ে পেট্রোবাংলাকে ফেনী গ্যাসক্ষেত্রের কিছু পাওনা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ২০১৬ সালে বাপেক্সের মাধ্যমে বাংলাদেশ নাইকোর বিরুদ্ধে প্রায় ১১৭ কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করে নতুন মামলা করে। সেই মামলার চূড়ান্ত রায়ে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল নাইকোকেই বিস্ফোরণের জন্য সরাসরি দায়ী বলে উল্লেখ করে।
ট্রাইব্যুনালের মতে—
আন্তর্জাতিক পেট্রোলিয়াম শিল্পের নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুসরণে ব্যর্থ হওয়া এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা না নেওয়ার কারণেই এই বিস্ফোরণ ঘটে।
রায়ের গুরুত্ব ও প্রভাব
এই রায় বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ—
- প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শক্ত অবস্থান
- বিদেশি কোম্পানির দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার নজির
- ভবিষ্যৎ জ্বালানি চুক্তিতে সতর্কতা ও স্বচ্ছতার বার্তা
উপসংহার
টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র মামলায় আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশের জয় প্রমাণ করেছে যে দীর্ঘ আইনি লড়াই, সঠিক তথ্য ও রাষ্ট্রীয় দৃঢ়তা থাকলে বৈশ্বিক অঙ্গনেও ন্যায়বিচার আদায় সম্ভব। এই রায় দেশের জ্বালানি খাত ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
