গ্রেপ্তার নয়, নিষেধাজ্ঞা—চট্টগ্রামে ‘দুষ্কৃতিকারী’ তালিকা ঘিরে প্রশ্ন

শেয়ার করুন

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় নজিরবিহীন এক পদক্ষেপ নিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। ‘দুষ্কৃতিকারী’ আখ্যা দিয়ে তিন শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মহানগরে প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। পুলিশের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে যেমন আলোচনার ঝড় উঠেছে, তেমনি প্রশ্ন তুলছেন মানবাধিকারকর্মী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।

গত শনিবার প্রকাশিত ওই গণবিজ্ঞপ্তিতে প্রথম দফায় ৩৩০ জনের নাম ও ঠিকানা উল্লেখ করা হয়। পরে একজন মৃত ব্যক্তির নাম তালিকায় থাকায় সংশোধিত তালিকায় ২২৯ জনের নাম প্রকাশ করা হয়। সিএমপি বলছে, জননিরাপত্তা ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তবে তালিকাটি প্রকাশের পরই বিতর্কের জন্ম দেয় সেখানে থাকা নামগুলো। চট্টগ্রামের পরিচিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীর নাম। বিশেষ করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, মেয়র ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একাধিক সাবেক কাউন্সিলরের নাম থাকায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

তালিকায় বিএনপির কয়েকজন স্থানীয় নেতার নামও রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে বর্তমানে কারাগারে বন্দি ইসকন নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের নাম, যা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ জানান, নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য সহিংসতা ঠেকাতেই এই উদ্যোগ। তার ভাষায়, “এরা পরিচিত সন্ত্রাসী। এদের বিরুদ্ধে মামলা আছে, ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমি মনে করেছি, এই অতিরিক্ত পদক্ষেপটা নিলে জননিরাপত্তা আরও জোরদার হবে।”

তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এই পদ্ধতি আইনের শাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, কাউকে জননিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করলে গ্রেপ্তার ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নেওয়াই পুলিশের দায়িত্ব। গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এলাকা নিষিদ্ধ করা আইনকে পাশ কাটানোর শামিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা করছেন, এই সিদ্ধান্ত উল্টো ফলও বয়ে আনতে পারে। অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম বলেন, “যারা এতদিন চট্টগ্রামে ছিল, তারা অন্য জেলায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠার ঝুঁকি আছে।”

পুলিশের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে চট্টগ্রামের পরিচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মো. জাহেদ ওরফে ‘পিচ্চি জাহিদ’। এছাড়া মুন্না খান, রাজীব দত্ত, শওকত আজম, মো. মোস্তফাসহ আরও কয়েকজন কুখ্যাত সন্ত্রাসীর নাম রয়েছে। সাম্প্রতিক গুলির ঘটনায় আলোচিত ‘বড় সাজ্জাদ’ ও তার সহযোগীদের নামও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।

রাজনৈতিক অংশে তালিকায় রয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা। জুলাই মাসের সহিংসতার ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে, তাদের অনেকে বর্তমানে কারাগারে বা পলাতক অবস্থায় আছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

সিএমপি জানিয়েছে, ১৯৭৮ সালের চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশের ৪০, ৪১ ও ৪৩ ধারার ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। এসব ধারায় পুলিশ কমিশনারকে সহিংসতা প্রতিরোধে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারে।

তবে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন—যখন মাঠে সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে এবং যৌথ অভিযান চলছে, তখন এমন গণবিজ্ঞপ্তির প্রয়োজন ছিল কি না।

পুলিশ বলছে, এই তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে একদিকে সাধারণ মানুষ সচেতন হবে, অন্যদিকে অভিযুক্তদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি হবে, যা অপরাধ দমনে সহায়ক হবে।

গ্রেপ্তার না করে নিষেধাজ্ঞার এই কৌশল শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে—তা নিয়ে যেমন সংশয় রয়েছে, তেমনি এটি ভবিষ্যতে নজির হয়ে দাঁড়াবে কি না, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *