সংসদে সংযম, রাজপথে চাপ: নতুন দ্বিমুখী কৌশলে বিরোধী দল জামায়াত

শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিনিধি | গণ আওয়াজ


বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তবে নতুন এই অবস্থানে এসে দলটির কৌশল কেবল সংসদ ভবনের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। একদিকে সংসদে দায়িত্বশীল ও সংযত ভূমিকা রেখে নিজেদের একটি ইতিবাচক ‘সংসদীয় ভাবমূর্তি’ গড়ে তোলা, অন্যদিকে মাঠের তীব্র আন্দোলন ধরে রেখে দলের কট্টর সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণ করা, এই দ্বিমুখী নীতি তথা ‘সংসদে সংযম এবং রাজপথে চাপ’-এর কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে দলটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের তথ্য অনুযায়ী, জামায়াত বর্তমানে মূলত চারটি ক্ষেত্রকে সামনে রেখে তাদের রাজনৈতিক পরিকল্পনা সাজিয়েছে। এগুলো হলো, সংসদে সরকারের নিয়মতান্ত্রিক সমালোচনা, রাজপথে ধারাবাহিক কর্মসূচি, আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সংগঠন সম্প্রসারণ এবং আদালতে আইনি লড়াই।

সংসদে তথ্যভিত্তিক সমালোচনা ও সংযম

সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন পর্যন্ত জামায়াতের সংসদ সদস্যরা সরকারের বিভিন্ন নীতি ও বাজেটের সমালোচনা করলেও তা মূলত তথ্য-উপাত্তভিত্তিক রাখার চেষ্টা করছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সামষ্টিক অর্থনীতি, শিক্ষা ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে সংসদে দলটির সংসদ সদস্যরা নিয়মিত বক্তব্য দিচ্ছেন। এছাড়া জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিও তাঁরা জোরালোভাবে তুলছেন। বিতর্কিত কোনো বিষয়ে এ পর্যন্ত জামায়াত সংসদ থেকে চারবার ওয়াকআউট করেছে।
তবে সংসদীয় রাজনীতিতে একদম নতুন হওয়ায় কিছু অভিজ্ঞতার ঘাটতিও দৃশ্যমান হচ্ছে। জামায়াতের ৬৮ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ৬৪ জনই এবারই প্রথম সংসদে এসেছেন। ফলে সম্প্রতি সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দ ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন বা পর্দা চাওয়ার মতো কিছু দাবি এবং শব্দচয়ন নিয়ে জনমনে কিছুটা বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে জামায়াতের প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, সংসদীয় রীতিনীতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরও কিছু ত্রুটি দেখা যাচ্ছে, যা দলীয়ভাবে সতর্ক করা হয়েছে। একই সাথে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের মেলে ধরতে দলটি একটি ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠনের কাজও প্রায় চূড়ান্ত করে এনেছে।

রাজপথে সমান্তরাল সক্রিয়তা

সংসদের ভেতরে সংযত আচরণ করলেও রাজপথের আন্দোলনে বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ জামায়াত। বিগত চার মাসে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় ও জেলা শহরে জামায়াত এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোট অন্তত ৯ দিন বড় ধরনের বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। বর্তমানে বিদ্যুৎ সংকট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, সীমান্ত হত্যা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের কর্মসূচি চলছে।
সম্প্রতি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের এক বিশাল গণসমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন,

“গণভোটের রায় মেনে না নিলে আন্দোলনে কোনো বিশ্রাম নেওয়া হবে না। আন্দোলন চলবে সংসদে, আন্দোলন চলবে রাজপথে। রাজপথ ও সংসদ যেদিন একাকার হয়ে যাবে, সেদিন বালুর বাঁধ দিয়ে সমুদ্রের জোয়ার থামানো যাবে না।

একই সুর শোনা গেছে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কণ্ঠেও। তিনি জানান, জুলাই সনদ ও গণভোটের দাবি আদায় না হলে সংসদ ও রাজপথের আন্দোলনকে এক সুতায় গাঁথা হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই দ্বিমুখী কৌশল অত্যন্ত হিসাব-নিকাশ করা। দলটি এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চাচ্ছে। প্রথমত, সংসদে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে তারা প্রমাণ করতে চায় যে তারা একটি পরিপক্ব ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। দ্বিতীয়ত, রাজপথে কঠোর অবস্থানের মাধ্যমে তারা দলের তৃণমূল ও যুবসমাজকে চাঙ্গা রাখছে, যাতে মাঠের নিয়ন্ত্রণ অন্য কোনো দলের হাতে চলে না যায়। তবে সংসদীয় রীতিনীতির পরিশীলতা এবং রাজপথের উত্তাপ এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রেখে জামায়াত কতদূর এগোতে পারে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *