১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর সামরিক শাসক জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘ এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটে। এর পরের বছর, ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন—যা গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার প্রথম বড় ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
এরপর গত প্রায় সাড়ে তিন দশকে নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েন, আন্দোলন, বিতর্ক ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশে মোট সাতটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই লেখায় সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো সেই নির্বাচনগুলোর পটভূমি ও ফলাফল।
১৯৯১: সামরিক শাসনের অবসান ও গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন
এরশাদ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনে সব প্রধান রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে।
১৯৯৬: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রথম নির্বাচন
সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যুক্ত হওয়ার পর ১৯৯৬ সালের ১২ জুন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে একই বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচন বিরোধী দলগুলোর বর্জনের কারণে বিতর্কিত হয়ে পড়ে। টানা আন্দোলনের মুখে সংসদ ভেঙে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পুনরায় নির্বাচন আয়োজন করা হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।
২০০১: চারদলীয় জোটের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় নির্বাচন হয় ২০০১ সালে। এই নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট—যার মধ্যে জামায়াতে ইসলামীও অন্তর্ভুক্ত ছিল—বিজয় অর্জন করে। এর মাধ্যমে খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।
২০০৮: সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর নির্বাচন
দুই বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর ২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের আগে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ নামে পরিচিত। ওই সময় বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমানও আটক হন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় লাভ করে সরকার গঠন করে।
২০১৪: বর্জনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচন
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের প্রতিবাদে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের মুখে ২০১৪ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ বিরোধী দল এই নির্বাচন বর্জন করে। ফলে ১৫০টির বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয় আওয়ামী লীগ এবং টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে।
২০১৮: বিতর্কিত ‘রাতের ভোট’ নির্বাচন
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে। এই নির্বাচনে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো অংশ নিলেও ভোট কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগ ব্যাপকভাবে উঠে আসে। পরবর্তীতে এই নির্বাচন রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিতি পায়। নির্বাচনে আবারও জয় পায় আওয়ামী লীগ।
২০২৪: একতরফা নির্বাচন ও ক্ষমতার পতন
আওয়ামী লীগের টানা প্রায় ১৬ বছরের শাসনামলে ২০২৪ সালে তৃতীয়বারের মতো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি এই নির্বাচন বর্জন করে। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পুনরায় বিজয়ী হয়। তবে একই বছরের ৫ আগস্ট সংঘটিত এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দলটি ক্ষমতাচ্যুত হয়, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উপসংহার
গত ৩৫ বছরে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনগুলো শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণতন্ত্রের অবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি হিসেবেও কাজ করেছে। প্রতিটি নির্বাচন দেশের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা ও নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে।
