পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধ ২০২৬: সীমান্তে কী ঘটছে?
আফগানিস্তান সীমান্তে পাকিস্তানের আকস্মিক ড্রোন ও বিমান হামলায় নারী-শিশুসহ ১৭ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
ইসলামাবাদ একে ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ অভিযান বললেও তালেবান একে যুদ্ধের উসকানি হিসেবে দেখছে।
এর মধ্যেই ২৯৭ আফগান সেনা নিহতের দাবি এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের রহস্যময় মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
সীমান্তে আসলে কী ঘটছে?
সীমান্তে উত্তেজনার বর্তমান অবস্থা
দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সম্পর্ক এখন চরম উত্তেজনায়।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, রবিবার ভোরে আফগান ভূখণ্ডে পাকিস্তান বিমান ও ড্রোন হামলা চালায়।
এই হামলায় আবাসিক এলাকা ও ধর্মীয় স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হয়।
এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
দুই দেশের কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক এখন অস্থির অবস্থায়।
হামলার প্রেক্ষাপট ও পাকিস্তানের দাবি
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এটি ছিল গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক নির্ভুল অভিযান।
তাদের দাবি, ইসলামাবাদের একটি শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী হামলার পেছনে আফগানিস্তানভিত্তিক গোষ্ঠীগুলো জড়িত।
খাইবার পাখতুনখোয়ার বাজাউর ও বান্নু জেলায় সেনাদের ওপর হামলাকেও তারা একই নেটওয়ার্কের কাজ বলছে।
ইসলামাবাদের অভিযোগ, তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ও ইসলামিক স্টেট (আইএস) আফগান মাটি ব্যবহার করছে।
তারা পাকিস্তানে অস্থিরতা ছড়াচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
গত কয়েক মাসে এসব হামলায় অন্তত ১১ জন সেনা ও সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।
পাকিস্তানের বক্তব্য অনুযায়ী, TTP ও ISIS-K এর সাতটি গোপন আস্তানা ধ্বংস করাই ছিল মূল লক্ষ্য।
বারবার সতর্ক করার পরও তালেবান সরকার ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তাই তারা এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে বলে জানিয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতি ও বেসামরিক হতাহত
আফগানিস্তান এই হামলার ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে।
নাঙ্গারহার প্রদেশের বিহসুদ জেলা ও পাকতিকা প্রদেশে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়।
আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একটি মাদ্রাসা ও কয়েকটি আবাসিক বাড়ি ধ্বংস হয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদক ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নাঙ্গারহারে একটি বাড়িতে হামলায় একই পরিবারের ১২ শিশুসহ ১৭ জন নিহত হয়েছেন।
ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন।
নিহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্থানীয়রা বুলডোজার দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজনদের খুঁজছেন।
পাকিস্তানের চাঞ্চল্যকর দাবি
প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মুখপাত্র দাবি করেছেন, অভিযানে আফগান বাহিনীর ২৯৭ সদস্য নিহত হয়েছে।
তারা আরও দাবি করেছে, ৮৯টি সেনা চৌকি ধ্বংস হয়েছে।
১৩৫টি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানও ধ্বংস করা হয়েছে বলে বলা হয়েছে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী ‘নতুন প্রতিরোধ কাঠামো’ তৈরির কথা বলছে।
তাদের বার্তা স্পষ্ট।
আফগান মাটি ব্যবহার করে পাকিস্তানে হামলা হলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
তালেবান সরকারের কড়া হুঁশিয়ারি
আফগান তালেবান সরকার এই হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বলেছে।
তারা একে সুপ্রতিবেশী নীতির বিরোধী বলেও অভিহিত করেছে।
তালেবানের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ বলেছেন, পাকিস্তান নিজেদের নিরাপত্তা দুর্বলতা ঢাকতে নিরপরাধদের হত্যা করছে।
আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই হামলার উপযুক্ত ও পরিমিত জবাব দেওয়া হবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
সংকটময় পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের প্রশংসা করেছেন।
তিনি জানিয়েছেন, প্রয়োজন হলে তিনি হস্তক্ষেপ করতে পারেন।
অন্যদিকে, ইরান উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।
তেহরান সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছে।
ড্রোন নিষেধাজ্ঞা ও সীমান্ত পরিস্থিতি
চলমান যুদ্ধাবস্থার কারণে পাকিস্তানজুড়ে বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত ড্রোন ওড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই নির্দেশ জারি করেছে।
সীমান্ত ক্রসিংগুলো বন্ধ হয়ে গেছে।
ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ও যাতায়াত বিঘ্নিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের সঙ্গে আফগানিস্তানের সম্পর্ক বৃদ্ধিও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।
উত্তেজনার নেপথ্যের রাজনীতি
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে ২,৬০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুরান্ড লাইন নিয়ে বিরোধ পুরনো।
গত অক্টোবরেও সীমান্ত সংঘর্ষে প্রায় ৭০ জন নিহত হয়েছিল।
সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় একটি নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি চলছিল।
রবিবারের হামলা সেই প্রক্রিয়াকে ভেঙে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, টিটিপি ইস্যু এখন সরাসরি সামরিক সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।
ভবিষ্যৎ কোন দিকে?
এই হামলার ফলে বাণিজ্য ও যাতায়াত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও তলানিতে ঠেকেছে।
যদি তালেবান পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেয়, সংঘাত বড় আকার নিতে পারে।
পাকিস্তান নাগরিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে দাবি করছে।
তবে আফগান ভূখণ্ডে হামলা আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
এই সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
এটি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।
সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে বেসামরিক মৃত্যু কাম্য নয়।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জোরালো ভূমিকা এখন সময়ের দাবি।
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের এই সীমান্ত সংঘাত নিয়ে আপনার মতামত কী? কমেন্ট বক্সে জানান।
