সেই যৌন হয়রানির অভিযোগ সত্যি! তদন্ত রিপোর্টে ফেঁসে গেলেন সাবেক নির্বাচক মঞ্জুরুল

জাহানারা আলম এবং নির্বাচক মঞ্জুরুল ইসলাম বিতর্ক নারী ক্রিকেটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা
শেয়ার করুন

বিসিবির তদন্তে মঞ্জুরুলের ‘অসদাচরণ’ প্রমাণিত: নারী ক্রিকেটে তোলপাড় তোলা ঘটনার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ

সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলমের সেই বিস্ফোরক অভিযোগ কি তবে সত্যিই ছিল? দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) যে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর সত্য। নারী দলের সাবেক নির্বাচক ও ম্যানেজার মঞ্জুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন হয়রানি ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে স্বাধীন তদন্ত কমিটি। দেশের ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন লজ্জাজনক ঘটনা আগে কখনো এতোটা স্পষ্টভাবে সামনে আসেনি। কী আছে সেই প্রতিবেদনে? মঞ্জুরুলের বিরুদ্ধে এখন কী ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে বিসিবি? বিস্তারিত জানতে পড়ুন আজকের বিশেষ প্রতিবেদন।

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের দীর্ঘদিনের এক অন্ধকার অধ্যায় অবশেষে আলোর মুখ দেখল। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও তারকা পেসার জাহানারা আলমের তোলা যৌন হয়রানি ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে বিসিবির গঠিত স্বাধীন তদন্ত কমিটি। দীর্ঘ তদন্ত শেষে জমা পড়া এই প্রতিবেদনে বিসিবির সাবেক নির্বাচক ও ম্যানেজার মঞ্জুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ‘অনুপযুক্ত আচরণ’ ও ‘পেশাদারিত্বের পরিপন্থী’ কর্মকাণ্ডের প্রমাণ মিলেছে। এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আসার পর দেশের ক্রিকেট মহলে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। ক্রিকেটের মতো সম্মানজনক জায়গায় এমন ঘটনা নারী ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

জাহানারা আলম গত বছরের নভেম্বরে একটি ভিডিও সাক্ষাৎকারে মঞ্জুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মারাত্মক সব অভিযোগ আনেন। বিশেষ করে ২০২২ সালের নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপ এবং দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের সময়কার ঘটনাগুলো ছিল শিউরে ওঠার মতো। বিসিবি এই অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারক তারিক উল হাকিমের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে।

কমিটি তাদের দীর্ঘ বিশ্লেষণে জাহানারা আলমের করা চারটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ওপর নিবিড় তদন্ত চালায়। গত ২ ফেব্রুয়ারি বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। বুধবার (৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) বিসিবির এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জাহানারার চারটি অভিযোগের মধ্যে দুটির প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, মঞ্জুরুল ইসলামের কিছু আচরণ সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’ এবং ‘হয়রানি’র সংজ্ঞায় পড়ে। যদিও অভিযুক্ত মঞ্জুরুল ইসলাম এই অভিযোগগুলোকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেছেন, তবে তদন্ত কমিটির হাতে আসা তথ্য-প্রমাণ তার বিরুদ্ধেই কথা বলছে।

তদন্ত কমিটির রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর বিসিবি কঠোর অবস্থানে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বিসিবি জানিয়েছে, ক্রিকেটের আঙিনায় কোনো ধরনের হয়রানি বা অশোভন আচরণ বরদাশত করা হবে না। যদিও মঞ্জুরুল ইসলামের সঙ্গে বিসিবির চুক্তি গত বছরের ৩০ জুন শেষ হয়ে গেছে, তবুও তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিসিবির লিগ্যাল টিম বা আইনি বিভাগকে ইতিমধ্যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যাতে অপরাধের ধরন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

বিসিবির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “বোর্ড হয়রানি এবং অসদাচরণের বিরুদ্ধে বিসিবির জিরো-টলারেন্স নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রাপ্ত তথ্য ও সুপারিশসমূহ নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।” দেশের প্রচলিত আইন এবং বিসিবির নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী মঞ্জুরুলকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এই ঘটনাটি বিসিবিকে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করেছে। ২০০৯ সালে হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে যে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে এবার সক্রিয় হয়েছে বোর্ড। বিসিবি পরিচালক ও উইমেন্স উইংয়ের চেয়ারপারসন রুবাবা দৌলাকে প্রধান করে একটি স্থায়ী ‘অভিযোগ ও সুরক্ষা কমিটি’ গঠন করা হয়েছে।

এই কমিটির মূল লক্ষ্য হবে:

নারী ক্রিকেটারদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ নিশ্চিত করা।

যেকোনো অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি করা।

ক্রিকেটার ও কর্মকর্তাদের জন্য বাধ্যতামূলক সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

রুবাবা দৌলার নেতৃত্বাধীন এই কমিটি ভবিষ্যতে এমন অপ্রীতিকর ঘটনা রোধে ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে কাজ করবে। ক্রিকেটাররা যাতে ভয়হীনভাবে তাদের সমস্যার কথা জানাতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করাই এখন বোর্ডের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

জাহানারা আলম যখন প্রথম এই অভিযোগগুলো প্রকাশ্যে আনেন, তখন অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। দেশের ক্রিকেটে একজন সিনিয়র ক্রিকেটারের এমন সাহসী পদক্ষেপ অন্যান্য নারী অ্যাথলেটদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপের সময় টিম ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকা মঞ্জুরুলের বিরুদ্ধে ‘কুপ্রস্তাব’ দেওয়া এবং ‘শারীরিকভাবে স্পর্শ’ করার মতো গুরুতর অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি।

তদন্তে সব অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও দুটি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া জাহানারার লড়াইকে যৌক্তিক প্রমাণ করেছে। ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, এই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে বিসিবি স্বচ্ছতার পরিচয় দিয়েছে। তবে শুধু প্রতিবেদন জমা দিলেই হবে না, অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে তবেই নারী ক্রিকেটাররা মাঠে নিজেদের নিরাপদ মনে করবেন।

আপনি কি মনে করেন এ ধরনের অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া কি উচিত নয়? কমেন্টে জানান!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *