কেমন ছিলো সরকারের প্রথম ১০০ দিন?

শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন | গণ আওয়াজ

ক্ষমতায় আসার পর যেকোনো সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে সাধারণত তার রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। নির্বাচনকালীন সময়ে এবং সরকার গঠনের পর জনগণের সামনে যে প্রতিশ্রুতিগুলো তুলে ধরা হয়েছিল যেমন দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে বাস্তবায়ন ইত্যাদি সেগুলোর বাস্তব অগ্রগতি এখন মূল্যায়নের পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এই প্রেক্ষাপটে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সম্প্রতি সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রম নিয়ে একটি বিস্তৃত মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক জটিল ও দ্বৈত বাস্তবতা। একদিকে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে কিছু ব্যতিক্রমী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ প্রশংসিত হয়েছে, অন্যদিকে সুশাসন, জবাবদিহি, দুর্নীতি দমন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতির ঘাটতি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক অংশগুলোর একটি হলো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। টিআইবি জানিয়েছে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশজুড়ে অন্তত ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। একই সময়ে ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি, ১৯৬টি অপহরণ এবং ২,২১৪টি চুরির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া দায়িত্ব পালনকালে পুলিশের ওপর ১২৯টি হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এসব পরিসংখ্যান শুধু অপরাধ বৃদ্ধির ইঙ্গিতই দেয় না বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো কতটা চাপের মুখে রয়েছে, সেই বাস্তবতাও সামনে নিয়ে আসে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি মানবাধিকার পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। টিআইবি’র তথ্য অনুযায়ী, এই ১০০ দিনে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩,৪৯৬টি ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০৯ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে মব জাস্টিস বা গণপিটুনির বহু ঘটনা ঘটেছে, যেখানে কয়েক ডজন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা যে এখনো সমাজে বিদ্যমান, এসব ঘটনা তারই প্রতিফলন।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো উগ্রবাদী ও অসহিষ্ণু প্রবণতার পুনরুত্থান। বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা, মাজার এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাগুলো দেখিয়েছে যে স্থানীয় প্রশাসন অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধমূলক ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারে, তবে সামাজিক সম্প্রীতির ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সম্পর্কেও টিআইবি গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৩০টি পৃথক ঘটনায় ১৮৮ জন সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে ১২ জনের বিরুদ্ধে মামলা এবং ৭ জনের গ্রেপ্তারের ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৬ এর কিছু বিতর্কিত ধারা এখনো মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে।

তবে পুরো চিত্রটি একপাক্ষিক নয়। সরকারের কিছু পদক্ষেপ টিআইবি নিজেও ইতিবাচক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা বাতিল, সরকারি প্লট বরাদ্দ বন্ধ, প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি প্রটোকল সীমিত করা এবং মন্ত্রীদের ব্যক্তিগত সফরে সরকারি সুবিধা ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার মতো সিদ্ধান্তগুলো জনমনে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের সময়মতো অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিত করার নির্দেশনাও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ব্যাপক অংশগ্রহণ, হাজারো প্রশ্নের উত্তর প্রদান এবং সক্রিয় বিতর্ক সংসদীয় কার্যক্রমে নতুন প্রাণ সঞ্চারের ইঙ্গিত দিয়েছে। দীর্ঘদিন পর সংসদকে কিছুটা হলেও কার্যকর বিতর্কের মঞ্চ হিসেবে দেখতে পাওয়া গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক লক্ষণ।

কিন্তু এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে শীর্ষ নেতৃত্বের সদিচ্ছা কি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে?

টিআইবি’র মূল্যায়ন বলছে, সেই উত্তর এখনো সন্তোষজনক নয়। রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যক্তিগত সততা বা কয়েকটি প্রতীকী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, কার্যকর আইন এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামোর ওপর। কিন্তু সরকারের প্রথম ১০০ দিন পার হয়ে গেলেও দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বৃদ্ধি বা নতুন নেতৃত্ব নিয়োগের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রণীত ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টি আইনে রূপান্তরিত হলেও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং দুর্নীতি দমনসংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ পুনর্বিবেচনার নামে স্থগিত বা বাতিল হয়েছে। অন্যদিকে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে এমন আইন দ্রুত পাস হওয়ার প্রবণতা ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

অর্থনৈতিক খাতেও একই ধরনের দ্বিধাগ্রস্ত বাস্তবতা বিদ্যমান। ব্যাংকিং খাত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও ব্যাংক রেজোলিউশন অ্যাক্ট ২০২৬ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই আইনের ফলে দুর্বল ও ঋণখেলাপি ব্যাংকের মালিকেরা পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। পাশাপাশি অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বৈধ করার বিধান বহাল থাকায় সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সংবাদ সম্মেলনে যে পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন, তার মূল বক্তব্য হলো কিছু প্রশংসনীয় নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত দেখা গেলেও এখনো নতুন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেনি। স্থানীয় সরকার, প্রশাসন, ব্যাংকিং খাত এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাবের অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ‘এবার আমাদের পালা’ ধরনের মানসিকতার পুনরুত্থান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয় যে ব্যক্তিগত সততা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা কখনোই শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না। সরকারের প্রথম ১০০ দিন সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। ইতিবাচক বার্তা রয়েছে, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের গতি নেই; পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, কিন্তু তার প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবায়ন এখনো অনিশ্চিত। নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রত্যাশা রয়েছে, কিন্তু পুরোনো অভ্যাসের ছায়াও রয়ে গেছে।

এই বাস্তবতায় সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নতুন কোনো স্লোগান দেওয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার ঘোষণাকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ দিতে হবে। স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে কার্যকর করতে হবে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পেশাদার ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ঘোষণাকে নয়, ফলাফলকেই মূল্যায়ন করে। সরকারের প্রথম ১০০ দিন একটি সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সেই সম্ভাবনা সত্যিকার অর্থে কাঠামোগত সংস্কার ও সুশাসনে রূপ নেয়, নাকি আরেকটি অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির ইতিহাস হয়ে থেকে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *