বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬: ২৬ অগ্রাধিকার ও ৪১ দফা সংস্কারের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনীতির মাঠে নতুন সমীকরণ নিয়ে হাজির হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বনানীর হোটেল শেরাটনে এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দলটি তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে। ‘নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের ইশতেহার’ নামে অভিহিত এই দলিলে দলটির পক্ষ থেকে ২৬টি অগ্রাধিকার এবং ৪১ দফা ভিশন তুলে ধরা হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে ধারণ করে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পূর্ণ বিলোপ এবং একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকারই এখন জামায়াতের রাজনীতির মূলমন্ত্র হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে ১৯৪৭, ১৯৭১ এবং ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানকে একই সূত্রে গেঁথেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “৪৭ না হলে ৭১ হতো না, আর ৭১ না হলে ২৪-এর বিপ্লব পেতাম না।” তার মতে, এই ইশতেহার কেবল কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং এটি একটি ‘জীবন্ত দলিল’। ২৫০ জনেরও বেশি দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞের মতামত এবং জন-আকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে তৈরি করা এই ইশতেহারকে দলটি ‘জনতার ইশতেহার’ হিসেবে দাবি করছে।
জামায়াতে ইসলামীর এবারের ইশতেহারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো তাদের ১০টি মৌলিক প্রতিশ্রুতি, যা মূলত ‘৫টি ‘হ্যাঁ’ ও ৫টি ‘না’-এর মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।
৫টি ‘হ্যাঁ’: সততা, ঐক্য, ইনসাফ, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান।
৫টি ‘না’: দুর্নীতি, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ, বেকারত্ব ও চাঁদাবাজি।
এই স্লোগানের মাধ্যমে দলটি একটি পরিচ্ছন্ন ও নৈতিক বাংলাদেশ গড়ার বার্তা দিচ্ছে, যেখানে ব্যক্তির চেয়ে দল এবং দলের চেয়ে দেশ বড়—এই দর্শনের প্রতিফলন ঘটবে।
ইশতেহারে ২৬টি বিষয়কে বিশেষভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যা রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১. নির্বাচনী সংস্কার ও পিআর পদ্ধতি: সমানুপাতিক (পিআর) পদ্ধতির নির্বাচন প্রবর্তন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে একটি কার্যকর গণতন্ত্র নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
২. জুলাই সনদ ও বিচার নিশ্চিতকরণ: জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস সংরক্ষণ, শহীদ ও আহতদের পুনর্বাসন এবং বিগত দেড় দশকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হওয়া সব খুন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচারের কথা বলা হয়েছে।
৩. ফ্যাসিবাদ নির্মূল: ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পুনর্জন্ম রোধে চলমান বিচার ও সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
৪. যুব ও নারী উন্নয়ন: রাষ্ট্র পরিচালনায় যুবকদের প্রাধান্য এবং মন্ত্রিসভায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী সদস্য অন্তর্ভুক্ত করার বৈপ্লবিক পরিকল্পনা রয়েছে। নারীর জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে।
৫. স্মার্ট বাংলাদেশ ও প্রযুক্তি বিপ্লব: প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সমাজ গঠন এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ ভেজালমুক্ত খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ‘তিন শূন্য ভিশন’ (শূন্য পরিবেশগত অবক্ষয়, শূন্য বর্জ্য ও শূন্য বন্যা-ঝুঁকি) ঘোষণা করা হয়েছে।
জামায়াতের ইশতেহারে ব্যাংকিং খাত সংস্কার এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে ভেঙে পড়া অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে। সরকারি চাকরিতে আবেদনের ফি বাতিল এবং মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া রাজধানীর সাথে বিভাগীয় শহরগুলোর যাতায়াত দূরত্ব ২-৩ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা এবং নিম্নবিত্তদের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের মতো জনবান্ধব কর্মসূচিও স্থান পেয়েছে।
আমির শফিকুর রহমানের ভাষায়, “আমরা মজলুম ছিলাম, কিন্তু আমরা যেন কোনোভাবেই জালিম না হই।” এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, দলটি প্রতিশোধের রাজনীতির চেয়ে সংস্কার ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনেই বেশি মনোযোগী হতে চায়।
জামায়াতে ইসলামীর এই ইশতেহার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্র সংস্কারের আধুনিক রূপরেখাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। ‘মেজরিটি-মাইনরিটি’ বিভাজন ভুলে সবার সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের ইঙ্গিত দেয়। তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ এবং সংস্কারের প্রতিশ্রুতিগুলো তারা কতটা বাস্তবায়ন করতে পারবে, তা নির্ভর করবে আসন্ন নির্বাচনে ভোটারদের রায় এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।
আপনি কি এই ইশতেহারের কোনো নির্দিষ্ট পয়েন্ট যেমন—নির্বাচনী পিআর পদ্ধতি বা ‘তিন শূন্য ভিশন’ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত বিশ্লেষণ জানতে চান? কমেন্টে জানান!
পরবর্তী আপডেট পেতে আমাদের সাথেই থাকুন।
