দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ: সংবিধান সংস্কারে গণভোটই কি একমাত্র পথ?

শেয়ার করুন

বাংলাদেশে সংবিধান সংস্কার নিয়ে আলোচনা নতুন কিছু নয়, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিতর্কের চরিত্র বদলেছে। একসময় যেখানে সংস্কার মানেই ছিল কিছু ধারা সংশোধন বা প্রশাসনিক সমন্বয়, সেখানে এখন প্রশ্ন উঠছে রাষ্ট্র পরিচালনার পুরো কাঠামো নিয়েই। বিশেষ করে এককক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা আদৌ জনগণের প্রতিনিধিত্ব ও ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করতে পারছে কি না—এই প্রশ্নটি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেই কার্যত নির্বাহী ও আইন প্রণয়ন ক্ষমতা একই হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যায়। আইন প্রণয়ন, সংশোধন এমনকি সংবিধান পরিবর্তনের মতো গুরুতর সিদ্ধান্তও অনেক সময় সীমিত আলোচনায়, বিরোধী মতকে পাশ কাটিয়ে গৃহীত হয়।

এই প্রেক্ষাপটে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের ধারণা আবার আলোচনায় এসেছে। সমর্থকদের যুক্তি, একটি মাত্র কক্ষের ওপর পুরো আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া নির্ভরশীল হলে সেখানে ভুল, তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর বাস্তব কোনো দেয়াল থাকে না। দ্বিকক্ষব্যবস্থায় একটি কক্ষ আইন প্রস্তাব করবে, আরেকটি কক্ষ তা পুনরায় যাচাই করবে—এই দ্বিস্তর প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে। শুধু রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সব সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ তখন আর সহজ থাকে না।

কিন্তু এখানেই আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এত বড় কাঠামোগত পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত কে নেবে। সংসদ নিজেই যদি নিজের ক্ষমতার পরিধি নতুন করে নির্ধারণ করে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কারণ বাস্তবতা হলো, কোনো সংসদই স্বেচ্ছায় নিজের ক্ষমতা কমাতে আগ্রহী হয় না। এখানেই গণভোট প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সংবিধান তো কোনো দলের দলিল নয়, এটি রাষ্ট্রের এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের। তাই রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাঠামো বদলানোর সিদ্ধান্ত যদি সরাসরি জনগণের হাতে না যায়, তাহলে সেই সংস্কার রাজনৈতিক বৈধতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়ে।

গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যদি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের পক্ষে মত দেয়, তাহলে সেটি শুধু একটি সাংবিধানিক সংশোধন হবে না, বরং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ভাঙার একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা হবে। এতে ভবিষ্যতের যেকোনো সরকার জানবে, আইন প্রণয়ন মানে শুধু সংখ্যা দেখানো নয়, বরং জবাবদিহির মুখোমুখি হওয়া। আবার জনগণ যদি এই প্রস্তাবে না বলে, তাহলেও সেটি একটি স্পষ্ট রায়—বর্তমান এককক্ষবিশিষ্ট কাঠামোর দায় তখন আর রাজনীতিবিদদের একার ঘাড়ে থাকবে না, জনগণ নিজেরাই সেটির দায়িত্ব নেবে।

সব মিলিয়ে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও গণভোটের বিতর্ক আসলে একটি বড় প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করে—বাংলাদেশে গণতন্ত্র কি শুধু নির্বাচনের দিনেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি রাষ্ট্রের মৌলিক সিদ্ধান্তেও জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। সংবিধান সংস্কার সেই পরীক্ষারই একটি বড় মঞ্চ। এখানে সিদ্ধান্ত যতই জটিল হোক, সেটি যদি জনগণের সম্মতি ছাড়া হয়, তাহলে বিতর্ক থামবে না। কারণ শেষ পর্যন্ত সংবিধান কার—এই প্রশ্নের উত্তর জনগণ নিজে না দিলে, অন্য কেউ বিশ্বাসযোগ্যভাবে দিতে পারবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *