স্পিকার নেই, ডেপুটি স্পিকার কারাগারে: ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন ঘিরে সাংবিধানিক অনিশ্চয়তা

শেয়ার করুন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ঘিরে এক নজিরবিহীন সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। স্পিকার পদত্যাগ করে আত্মগোপনে রয়েছেন এবং ডেপুটি স্পিকার বর্তমানে কারাগারে থাকায় প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন কে? এই প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের পর দ্রুত সরকার গঠন, সংসদ সদস্যদের শপথ এবং নতুন মন্ত্রিসভার দায়িত্ব গ্রহণ সম্পন্ন হলেও সংসদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করতে গিয়ে দেখা দিয়েছে এই অচলাবস্থা। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে। সেই হিসাবে আগামী ১৩ মার্চের মধ্যেই অধিবেশন আহ্বান বাধ্যতামূলক।

এদিকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার—দুই পদই কার্যত শূন্য।
সংবিধানের ৭২(৬) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নতুন স্পিকার দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত বিদায়ী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই ধারার প্রয়োগ সম্ভব হচ্ছে না। দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করে আত্মগোপনে রয়েছেন এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু কারান্তরীণ। ফলে সংসদের সভাপতিত্বের ক্ষেত্রে একটি কার্যত সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে।

সংবিধানে এ ধরনের পরিস্থিতির সরাসরি কোনো ব্যাখ্যা না থাকলেও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি, ১৯৭৪-এর ৫(১) ধারা অনুযায়ী স্পিকার নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি একজন সদস্যকে মনোনীত করতে পারেন, যিনি সংসদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন এবং প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিধান বর্তমান সংকট নিরসনের একটি কার্যকর সাংবিধানিক পথ হতে পারে।

একই সঙ্গে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি চাইলে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শও নিতে পারেন। এতে ভবিষ্যতে কোনো আইনি বিতর্ক বা সাংবিধানিক প্রশ্নের অবকাশ থাকবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাষ্ট্রপতির মনোনয়নের মাধ্যমেই এই সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান সম্ভব। তবে সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিলে সিদ্ধান্তটি আরও শক্ত সাংবিধানিক ভিত্তি পাবে।

সরকারি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ১০ থেকে ১২ মার্চের মধ্যে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন বসতে পারে। সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শক্রমে সংসদ আহ্বান করেন। সেই প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশনেই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা বাধ্যতামূলক।

এছাড়াও সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। বর্তমান সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি ২০৮টি সাধারণ আসন অর্জন করেছে। সেই অনুপাতে দলটি প্রায় ৩৫ থেকে ৩৬টি সংরক্ষিত নারী আসন পেতে পারে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পাওয়া জামায়াতে ইসলামী পেতে পারে প্রায় ১১টি নারী আসন। অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের মধ্যেও কয়েকটি আসন বণ্টিত হবে।

সংরক্ষিত নারী আসনের তফসিল শিগগিরই ঘোষণা করা হতে পারে। সাধারণত সংসদ সদস্যদের ভোটেই এসব আসনের নির্বাচন হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফলাফল নির্ধারিত হয়।

রাজনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে। আইনসভার উভয় কক্ষেই ডেপুটি স্পিকারের পদ বিরোধী দলের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এই প্রস্তাবে সম্মত হয়েছে।

এ ছাড়া জাতীয় সংসদের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদও বিরোধী দলের সদস্যদের জন্য নির্ধারণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি, প্রিভিলেজ কমিটি, এস্টিমেটস কমিটি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি নতুন সংসদের সাংবিধানিক ভিত্তি স্থাপন এবং গণতান্ত্রিক কার্যক্রম শুরু করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির উদ্বোধনী ভাষণ, স্পিকার নির্বাচন, বিরোধীদলীয় নেতা নির্ধারণ, স্থায়ী কমিটি গঠন এবং বিভিন্ন সাংবিধানিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে সংসদের প্রথম অধিবেশনের সভাপতিত্বের প্রশ্নে সাংবিধানিক এই অচলাবস্থার সমাধান কীভাবে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *