শেষ হয়ে গেল ত্রয়োদশ নির্বাচন। ২০২৪ সালের গণ অভুত্থানের কারণে এই নির্বাচন ছিলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা সরকার গঠন হবার পর সবচেয়ে প্রধান আলোচিত বিষয় হচ্ছে সংবিধান সংশোধন। চলুন দেখে আসি ‘৭২ এ কার্যকর হবার পর থেকে বাংলাদেশ সংবিধানে কি কি পরিবর্তন এসেছে।
১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে গৃহীত এবং ১৬ ডিসেম্বর কার্যকর হওয়া বাংলাদেশের সংবিধান ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে নির্মিত একটি প্রগতিশীল দলিল। কিন্তু সেই দলিল স্থির থাকেনি। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পালাবদল, সামরিক হস্তক্ষেপ, গণআন্দোলন, আদালতের রায় এবং ক্ষমতার পালাবদলের ভেতর দিয়ে সংবিধানটি ১৯৭৩ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট ১৭ বার সংশোধিত হয়েছে। প্রতিটি সংশোধন শুধু আইনি ভাষার পরিবর্তন নয়, বরং সময়ের ক্ষমতার বাস্তবতার প্রতিফলন।
প্রথম চারটি সংশোধন আসে স্বাধীনতার পরপরই, শেখ মুজিবুর রহমান-এর নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে। ১৯৭৩ সালের প্রথম সংশোধনীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার পথ সুগম করা হয়। একই বছরে দ্বিতীয় সংশোধনী জরুরি অবস্থা জারির বিধান ও কিছু মৌলিক অধিকার স্থগিতের সুযোগ যুক্ত করে রাষ্ট্রের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয়। ১৯৭৪ সালের তৃতীয় সংশোধনী ছিল ভারত–বাংলাদেশ সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি করা। কিন্তু ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনী ছিল সবচেয়ে নাটকীয়; এতে সংসদীয় পদ্ধতি বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতি শাসন ব্যবস্থা চালু করা হয়, একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা পায় এবং বিচার বিভাগের ক্ষমতায় পরিবর্তন আনা হয়। এই সংশোধন দেশের রাজনৈতিক চরিত্রে বড় মোড় এনে দেয়।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সামরিক শাসনের বাস্তবতা সংবিধানেও প্রতিফলিত হয়। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমান-এর আমলে পঞ্চম সংশোধনী পাস হয়। এতে ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সময়কালের সামরিক আইন ও অধ্যাদেশসমূহকে বৈধতা দেওয়া হয় এবং সংবিধানের প্রস্তাবনায় “আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস” যুক্ত করা হয়, যা রাষ্ট্রের আদর্শিক অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। ১৯৮১ সালে আবদুস সাত্তার-এর সময়ে ষষ্ঠ সংশোধনী রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতার বিষয়ে পরিবর্তন আনে।
এরপর সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ-এর আমলে চারটি সংশোধনী পাস হয়। ১৯৮৬ সালের সপ্তম সংশোধনীতে ১৯৮২ থেকে ১৯৮৬ সময়কালের সামরিক আইনকে বৈধতা দেওয়া হয়। ১৯৮৮ সালের অষ্টম সংশোধনীতে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয় এবং হাইকোর্ট বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণের চেষ্টা করা হয়। ১৯৮৯ সালের নবম সংশোধনী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ ও নির্বাচনী বিধানে পরিবর্তন আনে। ১৯৯০ সালের দশম সংশোধনী সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ বাড়ায়। এই সময়ের সংশোধনীগুলো মূলত সামরিক শাসনের সিদ্ধান্তকে সাংবিধানিক সুরক্ষা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়।
১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের পর রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব নেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। ১৯৯১ সালের একাদশ সংশোধনী অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা দেয়। একই বছরে দ্বাদশ সংশোধনী পাস হয়, খালেদা জিয়া-এর নেতৃত্বে, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসন থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় ফিরে আসে বাংলাদেশ। এটি ছিল গণআন্দোলনের অন্যতম বড় অর্জন। ১৯৯৬ সালে ত্রয়োদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়, যাতে নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি হয়। ২০০৪ সালে চতুর্দশ সংশোধনীতে সংরক্ষিত নারী আসন বৃদ্ধি ও প্রধান বিচারপতির অবসর বয়স বাড়ানো হয়।
২০০৯ সালে সরকার গঠন করার পর শেখ হাসিনা-এর নেতৃত্বে ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। এতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, একই সঙ্গে সংবিধানের চার মূলনীতি পুনর্বহাল করা হয়, যদিও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল থাকে। এই সংশোধনী রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে। ২০১৪ সালের ষোড়শ সংশোধনীতে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে দেওয়া হয়, তবে পরবর্তীতে সর্বোচ্চ আদালত তা বাতিল ঘোষণা করে। ২০১৮ সালের সপ্তদশ সংশোধনী সংরক্ষিত নারী আসনের মেয়াদ আরও ২৫ বছর বাড়ায়।
এই দীর্ঘ যাত্রাপথে দেখা যায়, সংবিধান শুধু একটি আইনি দলিল নয়; এটি ক্ষমতার ভারসাম্য, রাজনৈতিক মতাদর্শ, গণআন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনের সঙ্গে পাল্টে গেছে বারবার। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতান্ত্রিক কাঠামো পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা, অন্যদিকে সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রভাব—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধনের ইতিহাস আসলে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেরই প্রতিচ্ছবি।
