পুলিশ কি কাউকে পেটাতে পারে?বঞ্চনা থেকে শীর্ষ পদ

আইজিপি আলী হোসেন ফকির ও সাম্প্রতিক পুলিশি কার্যক্রম
শেয়ার করুন

পুলিশ কি কাউকে পেটাতে পারে?সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিক্ষার্থী নিগ্রহ, কুষ্টিয়ায় সংসদ সদস্যের নৈতিক খবরদারি এবং পুলিশের আইনি ক্ষমতার সীমা নিয়ে বিশেষ বিশ্লেষণ।

পুলিশের শীর্ষ পদে বড় পরিবর্তনের মাঝেই শুরু হয়েছে উত্তপ্ত বিতর্ক। একদিকে বঞ্চনার শিকার আলী হোসেন ফকির নতুন আইজিপি, অন্যদিকে কুষ্টিয়া ও ঢাকায় পুলিশের ‘নীতি পুলিশি’ নিয়ে জনমনে ক্ষোভ। পুলিশ কি আসলেই কাউকে পেটাতে পারে? জানুন বিস্তারিত।

বাংলাদেশে পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে এক বৈপ্লবিক রদবদল ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ১৫তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের দক্ষ কর্মকর্তা আলী হোসেন ফকিরকে নতুন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। তবে এই বড় পরিবর্তনের ঠিক আগমুহূর্তে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে কুষ্টিয়ায় ‘মোরাল পুলিশিং’ এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিক্ষার্থী নিগ্রহের ঘটনাগুলো এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

নতুন আইজিপি আলী হোসেন ফকির ও বঞ্চনার অবসান
আলী হোসেন ফকির ১৯৯৫ সালে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। তবে বিগত সরকারের আমলে তিনি চরম বঞ্চনার শিকার হন। ২০২২ সালে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলেও গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি আবারও সগৌরবে ফিরে আসেন। তার নিয়োগের প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো:

পুলিশ বাহিনীর পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনা।

দলীয় প্রভাবমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলা।

বঞ্চিত কর্মকর্তাদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা।

কুষ্টিয়ায় ‘মোরাল পুলিশিং’ বিতর্ক
সম্প্রতি কুষ্টিয়ার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আমির হামজার উপস্থিতিতে পুলিশের এক কর্মকর্তাকে বাজারে গিয়ে দোকানিদের ধমকাতে দেখা গেছে। রমজানে নামাজের সময় টিভি চালানো বা ক্যারাম খেলা বন্ধ করতে তারা কড়া হুঁশিয়ারি দেন। যদিও আমাদের সংবিধানে এ ধরনের কোনো ‘মোরাল পুলিশিং’ বা নৈতিক খবরদারির অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি।

আইন কী বলে: সংবিধানের ৩২ ও ৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা রয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য: কুষ্টিয়ার এসপি জানিয়েছেন, এমন কোনো সরকারি নির্দেশনা ছিল না। ফলে ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে ইতিমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক নিগ্রহ
ঢাকায় মাদকবিরোধী অভিযানের নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাঈম উদ্দিন এবং সংবাদকর্মীদের ওপর লাঠিপেটার অভিযোগ উঠেছে। ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশের ডিসি মাসুদ আলমের সামনেই এক শিক্ষার্থীকে মাটিতে ফেলে নির্মমভাবে পেটানো হচ্ছে। ফলস্বরূপ, নাগরিক সমাজে পুলিশের এই মারমুখী আচরণ নিয়ে তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে। গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষী পুলিশ সদস্যদের চাকরি থেকে অব্যাহতির দাবি জানিয়েছে।

পুলিশ কি চাইলেই পেটাতে পারে?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, অভিযানে গিয়ে পুলিশ কি বলপ্রয়োগ করতে পারে? বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও মানবাধিকার নীতিমালা অনুযায়ী:

বলপ্রয়োগের সীমা: ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৬ থেকে ৫৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে আটক করতে যতটুকু শক্তি প্রয়োজন, তার বেশি প্রয়োগ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।

নির্যাতন বিরোধী আইন: ২০১৩ সালের ‘নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন’ অনুযায়ী, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন দণ্ডনীয় অপরাধ।

তল্লাশির নিয়ম: সিআরপিসির ১০২ ও ১০৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো বদ্ধ স্থান তল্লাশির সময় স্থানীয় নিরপেক্ষ সাক্ষী রাখা বাধ্যতামূলক।

আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের চ্যালেঞ্জ
নতুন আইজিপি এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছেন যখন পুলিশের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে। তার সামনে এখন বড় কাজ হলো পুলিশের এই ‘মারমুখী’ মানসিকতা পরিবর্তন করা। মাদক নির্মূল করতে হলে সীমান্তের চোরাচালান ও বড় সিন্ডিকেট ধরতে হবে, সাধারণ আড্ডারত শিক্ষার্থী বা নাগরিকদের ওপর চড়াও হওয়া কোনো সমাধান নয়। পরিশোধিতভাবে, পুলিশকে সত্যিকার অর্থে জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করতে হবে।

নতুন আইজিপির নিয়োগে যেমন আশার আলো দেখা যাচ্ছে, তেমনি মাঠপর্যায়ের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে। রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, তাই তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত পুলিশের একমাত্র ব্রত।

পুলিশি হয়রানি বন্ধে এবং নতুন আইজিপির কাজ নিয়ে আপনার মতামত কী? কমেন্টে জানান!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *