বিএনপির ‘গ্রিন সিগন্যাল’ নাকি শেখ হাসিনার গোপন নির্দেশ? নির্বাচনের পর কি ফিরছে আওয়ামী লীগ? তালা ভেঙে কার্যালয়ে প্রবেশ ও ঝটিকা মিছিল নিয়ে রাজনৈতিক মহলে তোলপাড়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই সারা দেশে এক ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ দেড় বছর পর গা ঝাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন নিষিদ্ধ ঘোষিত দল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। গত কয়েক দিনে দেশের অন্তত ১৫টি জেলায় তালা ভেঙে এবং জাতীয় পতাকা উড়িয়ে কার্যালয়ে প্রবেশ করেছেন তারা। কোথাও বিএনপির নেতার উপস্থিতিতে কার্যালয় উন্মুক্ত হচ্ছে, আবার কোথাও হেলমেট-মাস্ক পরে চলছে ঝটিকা অভিযান। কিন্তু প্রশ্ন হলো—অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিষিদ্ধ হওয়া এই দলটি কি তবে আবার রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হচ্ছে? নেপথ্যে কি কোনো বড় রাজনৈতিক সমঝোতা কাজ করছে? বিস্তারিত থাকছে আজকের বিশেষ প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে এক রহস্যময় তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে কার্যত আড়ালে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা এখন প্রকাশ্য হওয়ার চেষ্টা করছেন।
১৫ জেলায় কার্যালয় পুনরুদ্ধার
তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় আওয়ামী লীগের কার্যালয়গুলো পুনরায় খোলা শুরু হয়েছে। জামালপুর, কক্সবাজার, হবিগঞ্জ, রাজবাড়ী, পাবনা, রাজশাহী ও যশোরের বাঘাইছড়িতে কার্যালয় খুলে জাতীয় পতাকা এবং শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার ছবি টাঙানোর ঘটনা ঘটেছে। এমনকি ঝিনাইদহে পরিত্যক্ত কার্যালয়ে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি টাঙিয়ে ফুলের মালা দিতেও দেখা গেছে নেতাকর্মীদের।
বিএনপি-জামায়াতের সাথে গোপন সমঝোতা?
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটেছে পঞ্চগড়ের চাকলাহাটে। সেখানে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতির উপস্থিতিতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের তালা খুলে দেওয়া হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে বড় দলগুলো আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক টানতে স্থানীয় পর্যায়ে কিছু সমঝোতা করে থাকতে পারে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন বিএনপির ‘সবুজ সংকেত’ ছাড়া আওয়ামী লীগের পক্ষে এই সাহস দেখানো সম্ভব ছিল না। তবে লেখক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, এটি স্থানীয় পর্যায়ের ছোটখাটো সমঝোতা হতে পারে, যার প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতে খুব বেশি পড়বে না।
কেন্দ্রীয় নির্দেশ ও শেখ হাসিনার পরামর্শ
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম দাবি করেছেন, দলীয় কার্যালয় নিষিদ্ধ বা বাজেয়াপ্ত করা হয়নি, তাই সেখানে যেতে কোনো বাধা নেই। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, শেখ হাসিনা নিয়মিত বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে তৃণমূল নেতাদের সাথে যোগাযোগ রাখছেন এবং তাদের কার্যালয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিনের ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যাওয়ার কর্মসূচিও কর্মীদের মাঝে কিছুটা সাহস জুগিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
পাল্টা হামলা ও অস্থিরতা
আওয়ামী লীগের এই তৎপরতা সর্বত্র মসৃণ হয়নি। ময়মনসিংহের তারাকান্দায় কার্যালয় খোলার পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও এনসিপির নেতাকর্মীরা টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেছে। এছাড়া অনেক জায়গায় কার্যালয় খোলার কিছুক্ষণ পরেই সটকে পড়তে হয়েছে নেতাকর্মীদের। বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, নির্বাচিত সরকার আসার পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে হয়তো আওয়ামী লীগকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের এই ফিরে আসার চেষ্টা কি তবে দেশের রাজনীতিতে নতুন কোনো সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে? নাকি এটি কেবলই একটি সাময়িক তৎপরতা? সময় এর উত্তর দিবে। তবে এটা স্পষ্ট যে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিষিদ্ধ এই দলটি আবারও তাদের অস্তিত্ব জানান দিতে মরিয়া।
আওয়ামী লীগের এভাবে ফিরে আসা এবং কার্যালয় খোলার বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন? কমেন্ট করে জানান।
