মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার অদৃশ্য কেন্দ্রবিন্দু, চার দশকের এক অনমনীয় শাসনের প্রতীক, এবং পশ্চিমবিরোধী প্রতিরোধের সবচেয়ে দৃশ্যমান মুখ ছিলেন আলি খামেনি। ৮৬ বছর বয়সী এই সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু নিয়ে যখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র জল্পনা, তখন যুদ্ধ, ক্ষমতা ও উত্তরাধিকার সবকিছুই নতুন করে প্রশ্নের মুখে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় খামেনি নিহত হয়েছেন। ইসরায়েলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, তেহরানে বোমা হামলার পর তার দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেনি ইরান সরকার। তবে স্যাটেলাইট চিত্রে তার তেহরান কম্পাউন্ডের ব্যাপক ধ্বংসের প্রমাণ মিলেছে যা ছিল হামলার প্রথম লক্ষ্যগুলোর একটি।
১৯৮৯ সাল থেকে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানকে। সেই সময় থেকে তার শাসন কেবল রাজনৈতিক ছিল না; এটি ছিল এক আদর্শিক যুদ্ধ যেখানে রাষ্ট্র, ধর্ম এবং সামরিক শক্তি একীভূত হয়ে একটি অনন্য ক্ষমতার কাঠামো তৈরি করে।
সংকটের মধ্যেই শেষ অধ্যায়?
তার শাসনের শেষ বছরগুলো ছিল ক্রমবর্ধমান সংকটে ঘেরা। অর্থনৈতিক দুরবস্থা, গণবিক্ষোভ, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা সব মিলিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর চাপ বেড়েই চলছিল। চলতি বছরেই মূল্যবৃদ্ধি বিরোধী বিক্ষোভে কঠোর দমন-পীড়নের নির্দেশ দেন খামেনি, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনী সরাসরি গুলি চালায়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, ইসরায়েলের ওপর ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য আমূল বদলে দেয়। ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর ধারাবাহিক আঘাত আসে। লেবাননে তাদের প্রধান মিত্র দুর্বল হয়ে পড়ে, আর সিরিয়ায় সরকার পতন ইরানের কৌশলগত অবস্থানকে সংকুচিত করে।
এই প্রেক্ষাপটে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ছিল খামেনির শেষ প্রতিরক্ষা। যুক্তরাষ্ট্র বারবার তা পরিত্যাগের দাবি জানালেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এই অটল অবস্থানই শেষ পর্যন্ত তাকে সরাসরি হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ক্ষমতার প্রকৃত ভিত্তি: নিরাপত্তা কাঠামো
খামেনির ক্ষমতা টিকে ছিল মূলত এক বিশ্বস্ত নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর, যার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং আধাসামরিক বাহিনী বাসিজ। ২০০৯ সালের নির্বাচনী বিক্ষোভ থেকে শুরু করে ২০২২ সালে এক তরুণ কুর্দি নারীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন সবকিছুই এই বাহিনীগুলো নির্মমভাবে দমন করে।
এই নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের পাশাপাশি, তার নিয়ন্ত্রণে ছিল বহু বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য, যা সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করে।
দুর্বল নেতা থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু
তার রাজনৈতিক উত্থান ছিল নাটকীয়। ইরানের প্রতিষ্ঠাতা সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর পর খামেনিকে উত্তরসূরি করা হয় যদিও তখন তার ধর্মীয় মর্যাদা ও জনপ্রিয়তা ছিল তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি এমন এক ক্ষমতার কাঠামো তৈরি করেন, যেখানে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তার অনুমোদন ছাড়া সম্ভব ছিল না।
বিশ্লেষকদের মতে, ইতিহাসের এক অপ্রত্যাশিত মোড় একজন তুলনামূলক দুর্বল নেতাকে পরিণত করেছিল শতাব্দীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন হিসেবে।
এক যুগের অবসান, না নতুন অস্থিরতার শুরু?
যদি তার মৃত্যু নিশ্চিত হয়, তবে তা হবে শুধু একজন নেতার মৃত্যু নয়; এটি হবে একটি আদর্শিক যুগের সমাপ্তি। খামেনি ছিলেন সেই ব্যক্তি, যিনি ইরানকে পশ্চিমের বিরুদ্ধে এক স্থায়ী প্রতিরোধের প্রতীকে পরিণত করেছিলেন।
এখন প্রশ্ন একটাই তার অনুপস্থিতিতে ইরান কি নতুন বাস্তবতার দিকে এগোবে, নাকি আরও কঠোর ও অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের দিকে?
ক্ষমতার শূন্যতা কখনো শূন্য থাকে না। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যে আগুন জ্বলছে, তার ছাই থেকে নতুন এক শক্তির জন্ম হবে এটাই ইতিহাসের নিয়ম।
