দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে। সয়াবিন তেল ও মুরগির দামের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। একদিকে ভোজ্যতেলের বাজারে সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির চাপ, অন্যদিকে মুরগির ‘রেকর্ড’ দাম, সব মিলিয়ে বাজার পরিস্থিতি এখন চরম অস্বস্তিকর।
গত বছরের নভেম্বর থেকেই ভোজ্যতেলের বাজারে অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। অভিযোগ রয়েছে, ৫-৬টি বড় কোম্পানির সিন্ডিকেট কৌশলে সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। বাজারে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও বোতলজাত সয়াবিন তেল হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। একই সময়ে খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে প্রায় ৩৫ টাকা বাড়িয়ে ২১০ টাকায় বিক্রি করা শুরু হয়, যা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি। এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে বাজারে সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দাম বাড়ানোর একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা চলছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে সাম্প্রতিক নতুন মূল্যবৃদ্ধির চাপ। মিলমালিকদের সংগঠন সরকারকে চিঠি দিয়ে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১৯৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০৭ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। শুধু প্রস্তাবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি তারা; সরকারের অনুমোদনের আগেই নতুন দাম কার্যকর করার ঘোষণাও দিয়েছে। এমনকি দাবি না মানলে সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। এতে স্পষ্ট যে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের চেয়ে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রভাব অনেক বেশি হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, ব্যবসায়ীদের যুক্তি একেবারে অমূলক নয় বলেও দাবি করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে যাওয়াকে তারা প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের মতে, আগে যেখানে প্রতি টন তেলের দাম ছিল প্রায় ১১০০ ডলার, এখন তা বেড়ে ১৩৭০ ডলারে পৌঁছেছে। এই বৃদ্ধির কারণে কোম্পানিগুলো দীর্ঘদিন লোকসানে পণ্য বিক্রি করছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিশ্লেষণ বলছে, বর্তমান দেশীয় মূল্যই আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তাই নতুন করে দাম বাড়ানোর যৌক্তিকতা নেই।
মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে এক লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় পাঁচ লিটারের বোতলও পাওয়া যাচ্ছে না। খোলা তেল কিনতে গিয়ে ক্রেতাদের সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে লিটারে ৩০-৩৫ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডিলাররা তেল সরবরাহ বন্ধ রেখেছে এবং নতুন দামের অপেক্ষায় আছে। অর্থাৎ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজারে চাপ তৈরি করা হচ্ছে, এমন অভিযোগ আরও জোরালো হচ্ছে।
এই সংকটের মধ্যেই মুরগির বাজারেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্রয়লার মুরগির দাম ‘রেকর্ড’ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য বড় ধাক্কা। খামার পর্যায়ে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, খাদ্যের দাম বাড়া এবং সরবরাহ চেইনের দুর্বলতা এসব কারণ দেখানো হলেও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এখানেও মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের ভূমিকা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। উৎপাদক ও খুচরা বাজারের দামের মধ্যে বড় পার্থক্য এই সন্দেহকে আরও জোরদার করছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান শুরু করেছে। র্যাবের মোবাইল কোর্ট বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অস্বাভাবিক মজুতের প্রমাণ পেয়েছে এবং জরিমানাও করেছে। তবে এসব বিচ্ছিন্ন অভিযান বাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা আনতে পারছে না। কারণ সমস্যার মূল জায়গা সরবরাহ ব্যবস্থা ও বাজার তদারকির দুর্বলতা এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর তদারকির অভাবই এই সংকটের মূল কারণ। যখন দাম বাড়ানোর প্রয়োজন ছিল না, তখনও ব্যবসায়ীদের চাপে দাম সমন্বয় করা হয়েছে, আবার যখন নিয়ন্ত্রণ জরুরি, তখন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী বারবার সুযোগ নিচ্ছে।
সব মিলিয়ে সয়াবিন তেল ও মুরগির বাজারের বর্তমান অস্থিরতা শুধু সাময়িক মূল্যবৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি দেশের বাজার ব্যবস্থাপনার গভীর সংকটের প্রতিফলন। সিন্ডিকেটের প্রভাব, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাত এই তিনের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে একটি জটিল পরিস্থিতি, যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ। এখন দেখার বিষয়, সরকারের আসন্ন বৈঠক ও পদক্ষেপ এই অচলাবস্থা ভাঙতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
