বাজারে ভোজ্যতেলের অদৃশ্য খেলা: সরবরাহ আছে, তবুও সংকট কেন?

শেয়ার করুন

রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত একই গল্প। দোকানে গিয়ে বোতলজাত সয়াবিন তেল নেই, থাকলেও “চেনা ক্রেতা” বা বাড়তি দামে। বাধ্য হয়ে খোলা তেল কিনছেন সাধারণ মানুষ, তাও আবার সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দিয়ে।

রোববার রাজধানীর সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারে বেসরকারি চাকরিজীবী মাহমুদ আলীর অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। চারটি দোকান ঘুরেও বোতলজাত তেল পাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত প্রতি লিটার ২০০ টাকা দরে খোলা সয়াবিন কিনতে হয়েছে যেখানে সরকার নির্ধারিত দাম ১৭৬ টাকা। তাঁর ভাষায়, “বাজারে তেল নিয়ে যেন ইঁদুর-বিড়াল খেলা চলছে। বেশি দামে কিনছি, দেখার কেউ নেই।”

একই দিনে তেজকুনিপাড়ায় মনিরা আক্তার বোতলজাত তেল পেলেও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দিয়ে কিনতে হয়েছে। পাঁচ লিটারের বোতল ৯৫৫ টাকার বদলে ৯৭০ টাকায় কিনতে হয়েছে তাঁকে। “না পেলে তো আরও বেশি দিতেই হতো” এই কথাতেই ফুটে ওঠে ভোক্তার অসহায়তা।

এই দুই অভিজ্ঞতা ব্যতিক্রম নয় বরং সারাদেশের বর্তমান ভোজ্যতেল বাজারের একটি সাধারণ চিত্র।

সরবরাহ আছে, কিন্তু বাজারে নেই।

সরকারি তথ্য বলছে, দেশে ভোজ্যতেলের আমদানিতে বড় কোনো ঘাটতি নেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে প্রায় ২ লাখ ৫৯ হাজার টনের বেশি অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি হয়েছে। একই সময়ে পামঅয়েল আমদানি হয়েছে ৪ লাখ ২২ হাজার টনেরও বেশি।

অর্থাৎ কাগজে-কলমে সরবরাহের ঘাটতি নেই। বরং নিয়মিত আমদানি চলছে।

কিন্তু বাস্তব বাজারে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র দোকানে তেল নেই, থাকলেও লুকিয়ে বিক্রি হচ্ছে, আর খোলা তেলের দাম লাগামছাড়া। এই বৈপরীত্যই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: তেল কোথায় যাচ্ছে?

লিটারে ১৮–২২ টাকা বেশি: ভোক্তার ওপর চাপ

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে:

  • খোলা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ১৯৫–১৯৮ টাকা লিটার
  • পামঅয়েল ১৮৪–১৮৫ টাকা
  • অথচ নির্ধারিত দাম যথাক্রমে ১৭৬ ও ১৬৬ টাকা

অর্থাৎ প্রতি লিটারে ভোক্তাদের অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে ১৮ থেকে ২২ টাকা পর্যন্ত।

বোতলজাত তেলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। পাঁচ লিটারের বোতল ৯৬০–৯৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি।

এই অতিরিক্ত ব্যয় সরাসরি প্রভাব ফেলছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর, যাদের দৈনন্দিন ব্যয়ের বড় অংশই এখন খাদ্যপণ্যে চলে যাচ্ছে।

কার দোষ? ব্যবসায়ী বনাম কোম্পানি

বাজারের এই অস্থিরতার জন্য একে অপরকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।

খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ:

  • কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে
  • দাম বাড়ানোর অনুমতি না পাওয়ায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে
  • তেলের সঙ্গে অন্যান্য পণ্য (মসলা, আটা, চা) কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে

এ ধরনের “বাধ্যতামূলক বান্ডলিং” ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ছে।

কোম্পানিগুলোর দাবি:

  • বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে (প্রতি টনে ১৫০–২০০ ডলার পর্যন্ত)
  • উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে তেল বিক্রি করতে হচ্ছে
  • সরবরাহ কমানো হয়নি, বরং নিয়মিত চলছে

তাদের মতে, মধ্যস্বত্বভোগীদের মজুত করার প্রবণতাই বাজারে সংকট তৈরি করছে।

বৈশ্বিক প্রভাব নাকি অভ্যন্তরীণ কারসাজি?

তেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে দায়ী করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে সয়াবিন ও পামঅয়েলের দাম বেড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

তবে প্রশ্ন হচ্ছে যদি আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়েও, তাহলে সেটার প্রভাব কি এত দ্রুত এবং এত অস্বাভাবিকভাবে খুচরা বাজারে পড়া স্বাভাবিক?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব থাকলেও অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, তদারকির অভাব এবং মজুতদারির মতো সমস্যাগুলো এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে।

তদারকির অভাব: সুযোগ নিচ্ছে অসাধু চক্র?

ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে কার্যকর তদারকির অভাবই এই সংকটের বড় কারণ।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মতে, কাগজে-কলমে তদারকি থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছেন।

অভিযোগগুলো হলো:

  • তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি
  • নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি
  • নির্দিষ্ট ক্রেতার কাছে গোপনে সরবরাহ

এই পরিস্থিতিতে বাজার কার্যত “নিয়ন্ত্রণহীন” হয়ে পড়ছে, যেখানে ভোক্তা হচ্ছে সবচেয়ে দুর্বল পক্ষ।

খোলা তেলের দিকে ঝুঁকছে বাজার

বোতলজাত তেলের সংকটের কারণে খোলা তেলের চাহিদা বেড়ে গেছে। কিন্তু এতে ঝুঁকি দ্বিগুণ:

১. দাম বেশি – নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি
২. মান নিয়ে প্রশ্ন – খোলা তেলের মান ও বিশুদ্ধতা নিয়ে সন্দেহ থাকে

কিছু ক্ষেত্রে বড় বোতল খুলে খোলা তেল হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে, যা সরবরাহ চেইনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

ডিলারদের বাস্তবতা: কমছে সরবরাহ ও কমিশন

কারওয়ান বাজারের এক ডিলার জানিয়েছেন:

  • আগে ১৫০–২০০ কার্টন তেল পেতেন
  • এখন পাচ্ছেন ১০০ বা তারও কম
  • কমিশন কমে গেছে (লিটারে ৪ টাকা থেকে ২–২.৫ টাকা)

এতে করে খুচরা ব্যবসায়ীদের লাভ কমে যাচ্ছে, ফলে তারা বাড়তি দামে বিক্রি করে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন এমন দাবি তাদের।

সরকারের অবস্থান: বাজার নিয়ন্ত্রণে?

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বলছে, বাজারে সরবরাহ আগের তুলনায় বেড়েছে এবং নিয়মিত তদারকি চলছে।

তাদের দাবি:

  • পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে
  • শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত আসছে
  • কয়েক দিনের মধ্যে বাজার স্বাভাবিক হবে

তবে বাস্তব বাজার পরিস্থিতি এই দাবির সঙ্গে পুরোপুরি মিলছে না। ভোক্তাদের অভিজ্ঞতা বলছে, সংকট এখনো প্রকট।

মূল সংকট কোথায়?

সব তথ্য একত্র করলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়:

১. আমদানিতে ঘাটতি নেই
২. সরবরাহ চেইনে কোথাও সমস্যা আছে
৩. মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ
৪. তদারকি দুর্বল
৫. ভোক্তা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত

অর্থাৎ এটি শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব নয় বরং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এবং সম্ভাব্য কারসাজির সম্মিলিত ফল।

সামনে কী হতে পারে?

যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে:

  • নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়বে
  • নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে
  • বাজারে অনিয়ম আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারে

ভোজ্যতেলের বর্তমান পরিস্থিতি শুধুমাত্র একটি পণ্যের সংকট নয় এটি বাজার ব্যবস্থাপনার একটি বড় সংকেত।

সরকার, কোম্পানি ও ব্যবসায়ীদের পারস্পরিক দোষারোপের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।

তাই এখন জরুরি:

  • বাজারে দৃশ্যমান ও কঠোর তদারকি
  • মজুতদারি ও কারসাজির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা
  • সরবরাহ চেইনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
  • নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি নিশ্চিত করা

অন্যথায় “সরবরাহ আছে, কিন্তু বাজারে নেই” এই অদ্ভুত বাস্তবতা আরও গভীর হবে।

এই সংকটের শেষ কোথায়, তা নির্ভর করছে এখন কার্যকর পদক্ষেপের ওপর কাগজে নয়, বাস্তব বাজারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *