টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ক্রিকেটে বড় ধরনের আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সঙ্গে একাধিক বৈঠক ও নাটকীয়তার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও বাস্তবতা হলো—বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে দল পরিবর্তনের সুযোগ কার্যত বন্ধ বলে জানিয়ে দিয়েছে আইসিসি।
আইসিসির বৈশ্বিক টুর্নামেন্টগুলোই ক্রিকেট বোর্ড ও ক্রিকেটারদের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। সে হিসেবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নিলে বিসিবি, জাতীয় দলের খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ এবং সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি অনিবার্য।
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের জন্যই একটি দল আইসিসির কাছ থেকে প্রায় ৩ থেকে ৫ লাখ মার্কিন ডলার পায়, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ থেকে ৬ কোটি টাকা। এই অর্থ থেকেই বোর্ডের একটি বড় অংশের পরিচালন ব্যয় নির্বাহ হয়। বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না খেললে এই অর্থ পুরোপুরি হাতছাড়া হবে।
এছাড়া খেলোয়াড়দের জন্য রয়েছে ম্যাচ ফি, পারফরম্যান্স বোনাস এবং প্রাইজমানির সুযোগ। একটি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেললেই একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটার ন্যূনতম আড়াই লাখ টাকা ম্যাচ ফি পান। বিশ্বকাপের মতো আসরে একাধিক ম্যাচ না খেলতে পারলে ব্যক্তিগত আয়েও বড় ধরনের ধাক্কা আসবে।
২০২৪ সালের আইসিসি পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রাইজমানির অঙ্ক ছিল ইতিহাসের সর্বোচ্চ। ওই আসরে রানার্সআপ দল পেয়েছিল প্রায় ১২ লাখ ৮০ হাজার ডলার, সেমিফাইনালে বিদায় নেওয়া দলগুলো পেয়েছিল ৭ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ ডলার করে। দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠতে না পারা দলগুলোর জন্যও ছিল ৩ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ ডলার।
এমনকি গ্রুপ পর্বে থাকা দলগুলোর জন্যও প্রাইজমানির অঙ্ক দুই লাখ ডলারের বেশি ছিল। প্রতিটি ম্যাচ জয়ের জন্য অতিরিক্ত ৩১ হাজার ডলার করে পুরস্কারও দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ অংশ না নিলে এসব সম্ভাব্য আয় পুরোপুরি হারাতে হবে।
বাংলাদেশের অনুপস্থিতির প্রভাব পড়তে পারে সম্প্রচার ও স্পন্সরশিপ আয়েও। ভারতীয় উপমহাদেশে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো সাধারণত উল্লেখযোগ্য টেলিভিশন দর্শক টানে। ফলে বাংলাদেশের ম্যাচ না থাকলে টিআরপি কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা বিজ্ঞাপনদাতা ও সম্প্রচারকারীদের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল বলেছেন, বাংলাদেশের মতো একটি বড় ক্রিকেট বাজার ছাড়া বিশ্বকাপ আয়োজন আইসিসির জন্যও ক্ষতির। তার মতে, বাংলাদেশ অংশ না নিলে প্রায় ২০ কোটি দর্শক হারাতে পারে এই টুর্নামেন্ট।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, আইসিসির সম্প্রচার স্বত্ব আগেই বিক্রি হয়ে যাওয়ায় তাদের সরাসরি ক্ষতি তুলনামূলক কম হবে। বরং বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে টেলিভিশন চ্যানেল ও বিজ্ঞাপনদাতারা।
এদিকে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার কূটনৈতিক টানাপোড়েনে টুরিস্ট ভিসা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দর্শক উপস্থিতি নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের ম্যাচগুলো কলকাতা ও মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও সাধারণ দর্শকদের জন্য মাঠে গিয়ে খেলা দেখার সুযোগ ছিল না।
এরই মধ্যে সাম্প্রতিক ঘটনায় আইপিএলে মোস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স দল থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়েও বাংলাদেশ সরকার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যেখানে একজন ক্রিকেটারের নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে পুরো দলের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
সব মিলিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি শুধু ক্রিকেটীয় নয়, বরং আর্থিক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক দিক থেকেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
