চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশের অর্থনীতি । শেয়ারবাজার, বাণিজ্য ঘাটতি ও রেমিট্যান্স

শেয়ার করুন

চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতার চেয়ে চাপ ও অনিশ্চয়তার চিত্রই বেশি স্পষ্ট হয়েছে। শেয়ারবাজারে সীমিত ঘুরে দাঁড়ানোর আভাস মিললেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফেরেনি। একই সঙ্গে আমদানি ব্যয়ের চাপ ও বাণিজ্য ঘাটতি অর্থনীতির ওপর চাপ বজায় রেখেছে। এই প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে রেমিট্যান্স।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সপ্তাহের শেষে প্রধান সূচক ডিএসইএক্স দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার ১৭৪ পয়েন্টে। জানুয়ারির শুরুতে যেখানে এই সূচক ছিল প্রায় ৪ হাজার ৯১০ পয়েন্ট, সেখানে কিছুটা উত্থান দেখা গেলেও বাজার এখনও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে নি। সপ্তাহজুড়ে লেনদেন মাঝারি থাকলেও বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রবাহ লক্ষ্য করা যায়নি। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও উচ্চ সুদের হার শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে।

বৈদেশিক বাণিজ্যের চিত্রও মিশ্র। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি আয় প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক খাতই প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে। তবে একই সঙ্গে শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের আমদানি ব্যয় বেশি থাকায় বাণিজ্য ঘাটতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। আমদানি ব্যয় রপ্তানি আয়ের তুলনায় বেশি থাকায় বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে চাপ অব্যাহত রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা হয়ে উঠেছে প্রবাসী আয়। ২০২৫ সালে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। শুধু ডিসেম্বর মাসেই প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি। চলতি সপ্তাহেও ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ স্বাভাবিক রয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।

রেমিট্যান্স প্রবাহের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে প্রায় ২৯ থেকে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে অবস্থান করছে। আইএমএফের BPM6 পদ্ধতি অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ২৬ থেকে ২৮ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। যদিও এই রিজার্ভ আমদানি ব্যয় মেটাতে সহায়ক, তবুও দীর্ঘমেয়াদে এটি ধরে রাখতে রপ্তানি আয় ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিকল্প নেই বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

ব্যাংকিং খাতে উচ্চ সুদের হার ও তারল্য সংকট ব্যবসা ও শিল্প খাতের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ঋণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় নতুন বিনিয়োগের গতি কমেছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলছে।

সব মিলিয়ে, চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় কোনো ধাক্কা এড়াতে পারলেও স্বস্তির জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করেই আপাতত বৈদেশিক খাতের ভারসাম্য বজায় রয়েছে। তবে শেয়ারবাজারে আস্থা ফেরানো, আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতির অভাবে অর্থনীতির চাপ আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র:

১. বাংলাদেশ ব্যাংক

২. ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ 

৩. এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো 

৪. দ্যা বিজনেজ স্ট্যান্ডার্ড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *