সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই বিপ্লবী, রাস্তায় নীরবতা—কেন?

শেয়ার করুন

এই সময়ের সবচেয়ে বড় ভ্রম যদি কিছু থাকে, তা হলো—আমরা খুব প্রতিবাদী এক সমাজ। ফেসবুক খুললেই তা মনে হয়। স্ক্রল করলেই দেখা যায় ক্ষোভ, রাগ, বিদ্রূপ, বিপ্লবী ভাষা। রাষ্ট্রের ভুল সিদ্ধান্তে তীব্র সমালোচনা, ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে আগুনঝরা স্ট্যাটাস, অন্যায়ের ভিডিওতে বজ্রনির্ঘোষ কমেন্ট। মনে হয়—এই সমাজ আর চুপ করে থাকবে না।

কিন্তু বাস্তব দৃশ্যটা ভিন্ন। রাস্তায় তাকালেই বোঝা যায়—এই প্রতিবাদের অধিকাংশই স্ক্রিনের ভেতর আটকে। শহরের মোড়ে মোড়ে নেই সেই উত্তাপ, নেই সেই সংঘবদ্ধ কণ্ঠ। সোশ্যাল মিডিয়ায় যেখানে হাজারো কণ্ঠ একসাথে চিৎকার করে, রাস্তায় সেখানে নীরবতা—কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর এক লাইনে নেই। এটা আমাদের সময়, আমাদের মানসিকতা, আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা—সব মিলিয়ে তৈরি হওয়া এক গভীর সংকট।

প্রথমেই যে সত্যটা স্বীকার করতে হয়, তা হলো ভয়। ভয় এখন আর কেবল পুলিশের নয়, লাঠির নয়, গ্রেপ্তারের নয়। ভয়টা বহুমাত্রিক। চাকরি হারানোর ভয়, সামাজিকভাবে চিহ্নিত হয়ে যাওয়ার ভয়, পরিবারকে সমস্যায় ফেলার ভয়। অনলাইনে এই ভয় অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত—একটা প্রোফাইল, একটা নাম, কখনো ছদ্মনাম। কিন্তু রাস্তায় নামা মানে নিজের শরীর, নিজের পরিচয়, নিজের ভবিষ্যৎ সামনে এনে দাঁড় করানো। এই ঝুঁকি নিতে সবাই পারে না। সবাইকে দোষ দিয়েও লাভ নেই।

দ্বিতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের ক্ষোভ নিষ্কাশনের আরামদায়ক জায়গা বানিয়ে দিয়েছে। আগে ক্ষোভ জমত, জমে জমে বিস্ফোরণ ঘটাত। এখন ক্ষোভ প্রতিদিনই বেরিয়ে যাচ্ছে—স্ট্যাটাসে, স্টোরিতে, রিলে। মনে হচ্ছে আমরা প্রতিবাদ করছি, আসলে আমরা নিজেদের শান্ত করছি। এই ডিজিটাল ক্যাথারসিস বিপজ্জনক, কারণ এটা পরিবর্তনের তাগিদ কমিয়ে দেয়। মনে হয়—“আমি তো বলেছি, লিখেছি, শেয়ার করেছি।” কিন্তু বাস্তবে কিছুই বদলায় না।

তৃতীয়ত, আছে সংগঠনের সংকট। ইতিহাসে কখনোই একক স্ট্যাটাস বিপ্লব আনেনি। বিপ্লব এসেছে সংগঠন থেকে, নেতৃত্ব থেকে, কাঠামো থেকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সবাই একা, সবাই নিজ নিজ পেজের নেতা। এখানে সমন্বয় নেই, শৃঙ্খলা নেই, দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নেই। ট্রেন্ড আসে, ট্রেন্ড যায়। কিন্তু ট্রেন্ডের ভেতর দিয়ে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক শক্তি গড়ে ওঠে না।

চতুর্থ কারণটি আরও গভীর—হতাশা। বহু মানুষ বিশ্বাসই করে না যে রাস্তায় নামলে কিছু বদলাবে। তারা মনে করে, ক্ষমতা অদৃশ্য, অজেয়। এই বিশ্বাস দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয়। যখন বারবার দেখা যায় প্রতিবাদ দমন হয়, ন্যায়বিচার আসে না, তখন মানুষ ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। প্রতিবাদ তখন আর আশা নয়, কেবল আবেগ হয়ে থাকে—আর আবেগ সবচেয়ে সহজে প্রকাশ পায় অনলাইনে।

আরও একটি বড় বিষয় হলো ডিজিটাল নায়কতন্ত্র। আজকের সময়ে লাইক, শেয়ার, ভিউ—এইগুলোই নতুন মুদ্রা। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদ মানেই দৃশ্যমানতা, প্রশংসা, অনুসারী। রাস্তায় এই পুরস্কার নেই। সেখানে আছে দীর্ঘ অপেক্ষা, ক্লান্তি, ঝুঁকি। ফলে প্রতিবাদও হয়ে ওঠে পারফরম্যান্স—কার্যকর রাজনৈতিক চর্চা নয়।

এখানে প্রশ্ন ওঠে—তাহলে কি সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিবাদ অর্থহীন? না। একেবারেই না। সোশ্যাল মিডিয়া আজকের সময়ে তথ্য ছড়ানোর শক্তিশালী মাধ্যম। এটি বয়ান তৈরি করে, আলোচনার দরজা খুলে দেয়, চেপে রাখা সত্য সামনে আনে। কিন্তু সমস্যা হয় যখন এটাকেই শেষ ধাপ মনে করা হয়। যখন স্ক্রিনের বাইরে যাওয়ার সাহস আর পরিকল্পনা থাকে না।

গণআওয়াজের ভাষায় বললে—সোশ্যাল মিডিয়া আগুনের খবর দেয়, কিন্তু আগুন জ্বালায় না। আগুন জ্বলে সংগঠনে, সংহতিতে, ধারাবাহিক প্রতিরোধে। অনলাইন প্রতিবাদ যদি অফলাইনের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে তা কেবল শব্দ হয়ে থেকে যায়।

এই নীরবতা ভাঙা সহজ নয়। কারণ এটি শুধু সাহসের প্রশ্ন নয়, এটি বিশ্বাসের প্রশ্ন। মানুষকে আবার বিশ্বাস করতে হবে—একসাথে দাঁড়ালে কিছু বদলায়। একা নয়, সংগঠিত হলে ভয় কমে। পোস্টের বাইরে এসে মানুষ মানুষকে দেখলে শক্তি জন্মায়।

নইলে আমরা এমন এক সমাজে পরিণত হব, যেখানে সবাই বিপ্লবী—কিন্তু বিপ্লব কখনো ঘটবে না। যেখানে ইতিহাস লেখা হবে স্ট্যাটাসে, কিন্তু বাস্তব বদলাবে না।

শেষ পর্যন্ত সত্যটা কঠিন কিন্তু পরিষ্কার—
স্ক্রিনে প্রতিবাদ নিরাপদ, রাস্তায় প্রতিবাদ কার্যকর।
আর কার্যকর প্রতিবাদ ছাড়া কোনো সমাজই দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *