বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের লড়াইয়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অন্যদিকে ধীরগতির প্রবৃদ্ধি। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন মুদ্রানীতিতে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—দাম নিয়ন্ত্রণই এখন প্রথম অগ্রাধিকার।
২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিসুদ (policy rate) ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য কমিয়ে প্রায় ৭ শতাংশের ঘরে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ানোর পরিবর্তে তা নিয়ন্ত্রণে রাখার পথই বেছে নেওয়া হয়েছে। এই অবস্থান অর্থনীতির ভাষায় “সংকোচনমূলক” বা tight monetary policy।
বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৮ থেকে ৮.৫ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। খাদ্যপণ্যের দাম বিশেষভাবে উঁচু। চাল, ডাল, তেল, সবজি—নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধিই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে তুলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামা পর্যন্ত নীতিসুদ কমানোর প্রশ্নই ওঠে না। অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদে ব্যবসা-বিনিয়োগের সুবিধার চেয়ে জনগণের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা—এই লক্ষ্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চিত্র ততটা আশাব্যঞ্জক নয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। আগের বছরগুলোর তুলনায় এটি স্পষ্টতই কম।
উচ্চ সুদহার ও কঠোর ঋণনীতির ফলে ব্যবসায়িক বিনিয়োগের গতি শ্লথ হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়েছে। ফলে নতুন শিল্প, সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থানে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিতে পারে।
এই পরিস্থিতিকে অনেক বিশ্লেষক “স্ট্যাগফ্লেশনধর্মী” ঝুঁকি বলে আখ্যা দিচ্ছেন—যেখানে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রিত নয়, আবার প্রবৃদ্ধিও শক্তিশালী নয়।
মুদ্রানীতির কার্যকারিতা পুরোপুরি নির্ভর করে ব্যাংকিং খাতের সুস্থতার ওপর। কিন্তু খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং কিছু ব্যাংকের দুর্বল আর্থিক ভিত্তি নীতির প্রভাবকে ধীর করে দিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদ বাড়ানো বা কমানোর সিদ্ধান্ত বাজারে দ্রুত ও সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না।
অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা পুনরুদ্ধারের পথে, এবং ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। এটি বহির্বাণিজ্য ও আমদানি ব্যয়ের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিক।
এই কঠোর নীতির ইতিবাচক দিক হলো—দাম বাড়ার গতি ধীরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এবং মুদ্রাবাজারে কিছু স্থিতি এসেছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদার করতে সহায়ক হতে পারে।
তবে ঝুঁকিও কম নয়। বিনিয়োগ কমে গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমবে। শিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা চাপের মুখে পড়বেন। প্রবৃদ্ধির হার দীর্ঘ সময় ধরে নিচু থাকলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান অবস্থান স্পষ্ট—আগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, পরে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার ভাবনা। কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতা হলো, শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত নীতি—রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত পরিবর্তন, উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়ন।
আজকের প্রশ্ন তাই একটাই: দাম কমানোর লড়াইয়ে আমরা কি প্রবৃদ্ধির গতি হারাচ্ছি, নাকি এই কঠোরতাই ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করছে?
সময়ই তার উত্তর দেবে। তবে আপাতত স্পষ্ট—বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি নিয়ন্ত্রিত কিন্তু চাপে থাকা পথে হাঁটছে।
