নির্বাচনী ইশতেহার: অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতার দ্বন্দ্ব

শেয়ার করুন

ঢাকা, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ । গণ আওয়াজ

আসন্ন ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের লড়াই মূলত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর মধ্যে। এই তিন দলের ইশতেহারে অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি একটি কেন্দ্রীয় স্থান দখল করেছে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি—যেখানে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪-৫ শতাংশের আশেপাশে স্থিতিশীল হয়েছে, মূল্যস্ফীতি ৭-৮ শতাংশের উপরে রয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগ কমে গেছে—এই প্রেক্ষাপটে দলগুলোর প্রতিশ্রুতিগুলো বিশ্লেষণ করলে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতার মধ্যে স্পষ্ট দ্বন্দ্ব দেখা যায়।

বিএনপি তার ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। বর্তমান অর্থনীতির আকার প্রায় ৪৫০-৫০০ বিলিয়ন ডলার থেকে এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে দীর্ঘমেয়াদি ১০-১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন, যা চীন বা ভিয়েতনামের মতো অভূতপূর্ব গতির উদাহরণ ছাড়া বিরল। দলটি বিনিয়োগ-চালিত অর্থনীতির দিকে রূপান্তর, বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগকে জিডিপির ২.৫ শতাংশে উন্নীত করা, ব্যাংকিং খাত সংস্কার এবং এসএমই ও স্টার্টআপের জন্য গ্যারান্টি স্কিমের মতো পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া ৪০ মিলিয়ন যুবকের জন্য কর্মসংস্থান, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতি পরিবারে মাসিক ২৫০০ টাকা বা সমমূল্যের পণ্য সহায়তা এবং ফার্মার কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের সাবসিডি, ঋণ ও বীমা প্রদানের প্রস্তাব রয়েছে। এসব প্রতিশ্রুতি জনপ্রিয় হলেও অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট উৎস এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

জামায়াতে ইসলামী তার ইশতেহারে আরও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে—২০৪০ সালের মধ্যে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি এবং মাথাপিছু আয় ১০,০০০ ডলার। এর জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে ৭ শতাংশে উন্নীত করা, রাজস্ব বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয় জিডিপির ২০ শতাংশে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। দলটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র, প্রযুক্তি-চালিত কৃষি, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং এবং আইসিটি খাতের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির উপর জোর দিয়েছে। বিশ্লেষকরা এই লক্ষ্যগুলোকে স্লোগান-নির্ভর বলে মনে করছেন, কারণ নির্দিষ্ট সময়সীমা, অর্থায়নের রূপরেখা এবং বাস্তবায়নের কাঠামোর অভাব রয়েছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), যা জুলাই বিপ্লবের যুব নেতৃত্ব থেকে উদ্ভূত, তার ৩৬-দফা ইশতেহারে তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছে। দলটি পাঁচ বছরে ১ কোটি সম্মানজনক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জাতীয় ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১০০ টাকা নির্ধারণ, ১০০ বিলিয়ন টাকার উদ্যোক্তা ফান্ড গঠন এবং মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া চাঁদাবাজি সম্পূর্ণ বন্ধ, কর-জিডিপি অনুপাত ১২ শতাংশে উন্নীত করে শিক্ষা-স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। যুবক-কেন্দ্রিক এই প্রতিশ্রুতিগুলো আকর্ষণীয় হলেও ফান্ডিংয়ের উৎস এবং বাস্তবায়নের বিস্তারিত পরিকল্পনা এখনো অস্পষ্ট।

তিন দলের ইশতেহারেই দুর্নীতি দমন, ব্যাংকিং সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক সুরক্ষার উপর জোর দেয়া হয়েছে, যা বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তবে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, এ ধরনের উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রতিশ্রুতি প্রায়শই অর্ধেক থেকে যায়। নির্বাচনের পর কোনো দল বা জোট ক্ষমতায় এলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং দ্রুত সংস্কারের উপর নির্ভর করবে এসব লক্ষ্য অর্জন। ভোটারদের জন্য এই ইশতেহারগুলো আশার আলো দেখালেও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ অপরিসীম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *