III মাদ্রাসা, নীরবতা ও বিচারহীনতার দশক: নেত্রকোনার শিশু ধর্ষণ মামলা আমাদের কী শেখাচ্ছে III
অবশেষে গ্রেফতার হয়েছে নেত্রকোনার আলোচিত অভিযুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষক আমান উল্লাহ সাগর। ১১ বছরের এক শিশুকে ধারাবাহিকভাবে ধর্ষণ এবং তার গর্ভধারণের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। অধিকাংশ সংবাদমাধ্যম এখনো তাকে “অভিযুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষক” হিসেবেই উল্লেখ করছে, আইনগতভাবে এটি সঠিক। কারণ পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও DNA পরীক্ষার আগে কাউকে চূড়ান্ত অপরাধী বলা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। কিন্তু এই সতর্কতা যেন অভিযোগকে হালকাভাবে নেওয়ার অজুহাত না হয়।
FIR অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবর থেকে মাদ্রাসায় ছুটির পর শিশুটিকে বিভিন্ন অজুহাতে আটকে রেখে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়েছে। বর্তমানে শিশুটি গুরুতর শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; তার শরীরে ২৭ সপ্তাহের ভ্রূণ। এই ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তি অপরাধ নয় এটি বাংলাদেশের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার ভয়াবহ প্রতিফলন।
গত এক দশকে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদ্রাসাকেন্দ্রিক যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ, বলৎকার, শারীরিক নির্যাতন এবং ধামাচাপা দেওয়ার বহু অভিযোগ সামনে এসেছে। ২০১৭ সালে নেত্রকোনা ও আশপাশ এলাকায় একাধিক আবাসিক মাদ্রাসা শিক্ষক শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিল। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে জামালপুর, নোয়াখালী, কুষ্টিয়া, পটুয়াখালী, নরসিংদীসহ বিভিন্ন জেলায় ছাত্র-ছাত্রী ধর্ষণ, বলাৎকার কিংবা যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মাদ্রাসা শিক্ষক বা সুপারদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, ধর্মীয় আবেগ বা সামাজিক ভয় এসব অভিযোগকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
সমস্যার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, আবাসিক বা অননুমোদিত মাদ্রাসাগুলোতে পর্যাপ্ত সরকারি মনিটরিং নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা দুর্বল, অভিভাবকদের সরাসরি প্রবেশ সীমিত, এবং ছাত্র-ছাত্রীদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা প্রায় অনুপস্থিত। ফলে শিক্ষক বা পরিচালকদের ক্ষমতা প্রায় প্রশ্নহীন হয়ে ওঠে।
মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো ধর্মীয় শিক্ষার আশায় সন্তানদের মাদ্রাসায় পাঠায়। কিন্তু যখন সেই প্রতিষ্ঠানেই শিশু নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে, তখন পরিবারগুলো সামাজিক লজ্জা, ধর্মীয় চাপ ও স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্যে প্রায় অসহায় হয়ে পড়ে। অনেক পরিবার মামলা করতেই সাহস পায় না। নেত্রকোনার সাম্প্রতিক ঘটনায় শিশুটির পরিবার আইনের আশ্রয় নিয়েছে, এটি ব্যতিক্রমী সাহসের পরিচয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, ধর্মীয় নেতৃত্ব কোথায়?
বাংলাদেশে বড় বড় আলেম, মাদ্রাসা বোর্ড বা ধর্মীয় সংগঠনগুলো প্রায়শই ইসলামবিরোধী বক্তব্য, রাজনৈতিক ইস্যু বা সামাজিক বিতর্কে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখালেও মাদ্রাসাভিত্তিক যৌন সহিংসতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ, দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক আন্দোলন খুব কম দেখা গেছে। ব্যতিক্রম থাকলেও সামগ্রিকভাবে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান অনুপস্থিত। এর ফলে সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হয় “সমস্যা সমাধানের চেয়ে প্রতিষ্ঠান রক্ষা কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ?”
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি: কোনো অপরাধী শিক্ষক পুরো মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে না। হাজারো সৎ শিক্ষক আছেন। কিন্তু যখন একই ধরনের অভিযোগ বারবার আসে এবং কাঠামোগত সংস্কার দৃশ্যমান হয় না, তখন সমালোচনা শুধু ব্যক্তির বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকে না, প্রতিষ্ঠানও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
শুধু নারী শিশু নয়, দীর্ঘদিন ধরে বহু মাদ্রাসায় কিশোর ছাত্রদের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগও এসেছে। সামাজিক ট্যাবু ও লজ্জার কারণে এসব মামলা আরও কম প্রকাশ পায়। ফলে প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
বিচার ব্যবস্থার অবস্থাও উদ্বেগজনক। আলোচিত কিছু ঘটনায় গ্রেফতার হলেও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ, ধীর এবং অনেক সময় জনদৃষ্টির বাইরে চলে যায়। ফলে সমাজে একটি বার্তা প্রতিষ্ঠিত হয় কিছুদিন আলোচনা হবে, তারপর সব থেমে যাবে। এই সংস্কৃতি অপরাধীদের সাহসী করে।
বাংলাদেশে শিশু অধিকার সংগঠন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো বহুবার মাদ্রাসা, এতিমখানা ও আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কঠোর তদারকি, নিবন্ধন, শিক্ষক যাচাই, সিসিটিভি, শিশু সুরক্ষা নীতিমালা এবং অভিযোগ ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছে। কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি এখনো সীমিত।
এই বাস্তবতায় প্রয়োজন:
প্রথমত, দেশের সব আবাসিক ও অনাবাসিক মাদ্রাসার বাধ্যতামূলক সরকারি নিবন্ধন ও নিয়মিত মনিটরিং।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগে অপরাধমূলক ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই।
তৃতীয়ত, শিশু সুরক্ষা নীতিমালা ও স্বাধীন অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা।
চতুর্থত, ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রকাশ্য ও কঠোর অবস্থান।
পঞ্চমত, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে শিশু যৌন নির্যাতনের মামলা নিষ্পত্তি।
বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে এখন প্রায়ই দেখা যায়, সমস্যা সমাধানের চেয়ে রাজনৈতিক বা আদর্শিক ট্যাগিং বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কিন্তু একটি ১১ বছরের শিশুর জীবন, শরীর ও ভবিষ্যৎ কোনো মতাদর্শের চেয়ে বড়?
নেত্রকোনার এই ঘটনা একটি জাতীয় আত্মসমালোচনার সুযোগ। আমরা কি শুধু ব্যক্তি অপরাধীকে গ্রেফতার করেই দায়িত্ব শেষ করবো, নাকি পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে সৎ আলোচনা করবো?
কারণ নীরবতা কখনো নিরপেক্ষতা নয়। অনেক সময় নীরবতা অপরাধের পক্ষে কাজ করে।
আজকের প্রশ্ন তাই শুধু আমান উল্লাহ সাগরের বিচার নয়; প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি তার শিশুদের নিরাপত্তাকে ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক সব স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখতে প্রস্তুত?
যদি উত্তর “হ্যাঁ” হয়, তাহলে এখনই প্রয়োজন কথার চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ। কারণ প্রতিটি বিলম্ব, প্রতিটি ধামাচাপা, প্রতিটি রাজনৈতিক বা ধর্মীয় অজুহাত ভবিষ্যতের আরও বহু শিশুকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
শিশু সুরক্ষা কোনো মতাদর্শিক বিতর্ক নয়, এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও মানবতার মৌলিক দায়িত্ব। মাদ্রাসা হোক বা স্কুল, এতিমখানা হোক বা আবাসিক প্রতিষ্ঠান, প্রত্যেক শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত।
নেত্রকোনার এই ঘটনা আমাদের সামনে আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে: প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা মানেই ধর্মকে আক্রমণ করা নয়; বরং অপরাধের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াই প্রকৃত নৈতিক দায়িত্ব।
আজ যদি আমরা নীরব থাকি, তাহলে আগামী দিনের ইতিহাস আমাদেরও দায়মুক্ত রাখবে না।
বাংলাদেশের শিশুদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখন প্রয়োজন জবাবদিহিতা, সংস্কার, কঠোর বিচার এবং সামাজিক সাহস। কারণ একটি সভ্য সমাজের পরিচয় তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিকদের নিরাপত্তা দিয়েই নির্ধারিত হয়।
