বাজেটের গোলকধাঁধায় আমজনতার যাপনচিত্র: সিন্ডিকেটের থাবা বনাম শুল্ক হ্রাসের শুভঙ্করের ফাঁকি

শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন | গণ আওয়াজ


জাতীয় সংসদে দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করা হয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারও অর্থমন্ত্রীর ব্রিফকেস থেকে বের হওয়া লাখ কোটি টাকার খতিয়ান, জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা আর উন্নয়নের চটকদার স্লোগান নিয়ে টেলিভিশনের টকশো ও সেমিনারে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। কিন্তু রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মৌলভীবাজার কিংবা প্রান্তিক জনপদের কোনো এক মুদি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে যখন সাধারণ মানুষ তাদের প্রতিদিনের থলেটি মেলছেন, তখন চারপাশের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতি বছর জুন মাস এলে দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকেরা এক ধরনের গাণিতিক আশ্বাসের বাণী শোনান, কিন্তু সেই আশ্বাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকে মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের পকেট কাটার এক নির্মম বন্দোবস্ত। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে সাধারণ মানুষের এক ধরনের প্রত্যাশা ছিল যে, হয়তো এবার বাজার নামক এই অদৃশ্য দানবটিকে নিয়ন্ত্রণে আনার কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা থাকবে। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটের চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং বাজারের মনস্তত্ত্ব খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এটি আসলে এক ধরণের শুভঙ্করের ফাঁকি ছাড়া আর কিছুই নয়। একদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর শর্ত পূরণের তাগিদ, অন্যদিকে রাজস্ব আদায়ের আকাশচুম্বী লক্ষ্যমাত্রা এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে অর্থমন্ত্রী যে বাজেটটি সাজিয়েছেন, তা বাহ্যিকভাবে কিছুটা জনবান্ধব মনে হলেও এর ভেতরের ক্ষতগুলো অত্যন্ত গভীর।

আমরা যদি তাত্ত্বিক অর্থনীতির খাতা থেকে চোখ সরিয়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় আসি, তবে দেখতে পাবো বাজেটে যেসব পণ্যের দাম কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে, সেগুলো আসলে সাধারণ মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছাতে কতগুলো অলক্ষ্য দেওয়াল পার হতে হয়।
এবারের বাজেটে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে দেখানো হয়েছে চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ভোজ্যতেল এবং ডালের মতো প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় মৌলিক খাদ্যপণ্যের উৎসে কর এক ধাক্কায় কমিয়ে মাত্র ০.৫% করার সিদ্ধান্ত। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, অর্থমন্ত্রী বুঝি সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্ট বুঝে বাজারে স্বস্তির বাতাস বইয়ে দিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ১% বা ২% উৎসে কর কমানোর সুফল কি আদৌ সাধারণ ক্রেতা পাবেন? বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এখানে ট্যাক্স বা শুল্ক এক টাকা বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ে পাঁচ টাকা, কিন্তু শুল্ক ১০ টাকা কমলেও পণ্যের দাম এক পয়সাও কমে না। এর মূল কারণটি লুকিয়ে আছে আমাদের সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খলের রন্ধ্রে রন্ধ্রে গড়ে ওঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মধ্যে। দেশের আমদানিকারক, পাইকারি আড়তদার এবং মিল মালিকদের একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী পুরো বাজারকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে জিম্মি করে রেখেছে। যখনই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার অজুহাত বা বাজেটে সামান্য কর বৃদ্ধির আভাস পাওয়া যায়, তখনই এরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাতারাতি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। অথচ যখন বাজেটে কর কমানো হয়, তখন এই সিন্ডিকেট বাবুরা অজুহাত দেখান যে, “আগের চড়া দামে কেনা পণ্য এখনও গুদামে শেষ হয়নি।” এই পুরনো চালের কাসুন্দি গেয়ে তারা মাসের পর মাস উচ্চ মূল্যে পণ্য বিক্রি করে সাধারণ মানুষের রক্ত চোষে, আর সরকার ও প্রশাসন কেবল নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।
বাজেটের এই কর হ্রাসের খেলায় আরেকটি বড় শুভঙ্করের ফাঁকি হলো মসলা ও খেজুরের শুল্কায়ন। জিরা, দারুচিনি, এলাচি, লবঙ্গ, গোলমরিচ ও ধনিয়ার ওপর থাকা ৫% নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং খেজুরেও সমপরিমাণ শুল্ক তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, একজন দিনমজুর বা রিকশাচালক কি প্রতিদিন এলাচি, লবঙ্গ বা জিরা খেয়ে বেঁচে থাকেন? একজন সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনধারণের জন্য প্রয়োজন সস্তা চাল, ডাল, তেল আর আলু। এই মৌলিক পণ্যগুলোর দাম যখন সিন্ডিকেটের ইশারায় আকাশে ওড়ে, তখন এলাচির দাম কেজিতে ৫০ টাকা কমল নাকি বাড়ল, তা দিয়ে আমজনতার পেটের ক্ষুধা মেটে না। উপরন্তু, শিশুখাদ্য ও গুঁড়ো দুধ তৈরির কাঁচামালের ওপর আমদানি শুল্ক ১৫% থেকে কমিয়ে ১০% করার যে প্রস্তাব, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই কর্পোরেট ব্রান্ডগুলো নিজেদের মুনাফা গোছানোর হিসাব কষতে শুরু করেছে। ডেইরি ও ফুড প্রসেসিং খাতের বড় বড় কোম্পানিগুলো সরকারের কাছ থেকে এই শুল্ক ছাড়ের শতভাগ সুবিধা লুফে নেবে, কিন্তু খুচরা বাজারে প্যাকেটের গায়ে লেখা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য বা এমআরপি কমাবে কিনা, তা নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। কারণ অতীতে দেখা গেছে, ভ্যাট বা শুল্ক ছাড়ের পর কোম্পানিগুলো তাদের প্যাকেজিং বা বিপণন খরচ বাড়ার অজুহাত দেখিয়ে সাধারণ ভোক্তাকে সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেছে।

শিক্ষিত তরুণ সমাজ ও মধ্যবিত্তের জন্য ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, প্রিন্টার ও মনিটরের ওপর থেকে সব ধরনের আমদানি শুল্ক, ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটিকে ডিজিটাল রূপান্তরের বড় চালিকাশক্তি হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু এর অন্য পিঠটি যদি আমরা দেখি, তবে দেখতে পাবো এই খাতের অধিকাংশ বড় আমদানিকারকই এক ধরনের মনোপলি বা একচেটিয়া ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। বাজারে নির্দিষ্ট কয়েকটি ব্র্যান্ডের ল্যাপটপ বা কম্পিউটার একচেটিয়া চলে এবং এই আমদানিকারকেরা নিজেদের মধ্যে যোগসাজশ করে দাম ধরে রাখেন। শুল্ক কমানোর ফলে আমদানিকারকদের মুনাফার খাতা আরও ভারী হবে, কিন্তু ফ্রিল্যান্সিং করতে যাওয়া প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন তরুণ কিংবা পড়াশোনার জন্য ল্যাপটপ কিনতে যাওয়া মধ্যবিত্তের সন্তানটি আদৌ কম দামে তা কিনতে পারবে কিনা, তা বাজার মনিটরিংয়ের অভাবের কারণে বরাবরের মতোই অনিশ্চিত। স্বাস্থ্য খাতের দিকে তাকালে দেখা যায়, ক্যান্সার প্রতিরোধী ওষুধ তৈরির ৯টি উপকরণের আমদানি শুল্ক শূন্য করা এবং কিডনি ডায়ালাইসিসের ফিল্টার ও চোখের লেন্সের শুল্ক কমানোর উদ্যোগটি অত্যন্ত মানবিক ও ইতিবাচক। কিন্তু বাংলাদেশের বেসরকারি হাসপাতাল এবং ফার্মেসি ব্যবসার যে নৈরাজ্য, সেখানে এই শুল্ক ছাড়ের প্রভাব কতটা পড়বে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। যেখানে একটি সরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিস করাতে এসে রোগীকে দিনের পর দিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় এবং বেসরকারি ক্লিনিকে হাজার হাজার টাকা গুনতে হয়, সেখানে আমদানিকৃত ফিল্টারের দাম সামান্য কমলেও সামগ্রিক চিকিৎসা সেবার ব্যয় সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণের নাগালের বাইরেই থেকে যাচ্ছে।

এবার আসা যাক বাজেটের সেইসব কালো অধ্যায়ে, যেখানে সরাসরি সাধারণ মানুষের পকেটে কাঁচি চালানো হয়েছে। অর্থমন্ত্রী অত্যন্ত চতুরতার সাথে কিছু জায়গায় শুল্ক ও ভ্যাট বাড়িয়েছেন, যার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়বে আবাসন ও নির্মাণ শিল্পে। রড, স্টিল ও সিমেন্ট তৈরির কাঁচামালের ওপর নতুন করে ভ্যাট ও করের বোঝা চাপানো হয়েছে। একটি উন্নয়নশীল দেশে আবাসন খাত কেবল একটি শিল্প নয়, এর সাথে জড়িয়ে থাকে লাখ লাখ নির্মাণ শ্রমিকের রুটি-রুজি এবং কোটি মধ্যবিত্তের সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে একটি মাথার ওপর ছাদ গড়ে তোলার স্বপ্ন। রড ও সিমেন্টের দাম যদি এই কর বৃদ্ধির কারণে আরও এক দফা বাড়ে, তবে সাধারণ মানুষের ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। ডেভেলপার কোম্পানিগুলো ইতিমধ্যেই তাদের বুকিং দেওয়া ফ্ল্যাটের দাম বাড়ানোর নোটিশ তৈরি করতে শুরু করেছে। এর ফলে শুধু যে ফ্ল্যাটের দাম বাড়বে তা নয়, বাজারে ইটের দাম, বালুর দামসহ সামগ্রিক নির্মাণ খরচ বেড়ে যাবে, যার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হবে সাধারণ ভাড়াটিয়াদের। কারণ বাড়িওয়ালারা তাদের নির্মাণ খরচ উসুল করতে নতুন বছরে বাসা ভাড়া বাড়িয়ে দেবেন। অর্থাৎ, অর্থমন্ত্রী কর বসালেন রডের ওপর, আর তার চাবুক এসে পড়ল শহরের ভাড়াটিয়া মধ্যবিত্তের পিঠে।
একইভাবে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার নামে আমদানি করা ওয়াশিং মেশিন এবং নির্দিষ্ট কিছু ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর ওপর ২০% সম্পূরক শুল্ক বসানো হয়েছে। প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে, দেশীয় শিল্পের বিকাশ ঘটাতে এটি একটি চমৎকার পদক্ষেপ। কিন্তু ভেতরে ঢুকে খোঁজ নিলে জানা যাবে, দেশে যে দু-একটি বড় কর্পোরেট গ্রুপ ওয়াশিং মেশিন বা রেফ্রিজারেটর অ্যাসেম্বলিং বা তৈরি করে, তাদের একচেটিয়া সুবিধা করে দেওয়ার জন্যই এই দেয়াল খাড়া করা হয়েছে। যখনই বিদেশি ভালো ব্র্যান্ডের পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক চাপিয়ে তার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তখন দেশীয় উৎপাদকেরা বাজারে কোনো প্রতিযোগিতা না থাকায় নিজেদের ইচ্ছামতো মানহীন পণ্য চড়া দামে বিক্রি করার লাইসেন্স পেয়ে যায়। এটিও এক ধরনের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট, যা প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে ভোক্তাকে জিম্মি করে ফেলে। এছাড়াও, সাধারণ মানুষের আমিষের চাহিদা মেটানোর শেষ আশ্রয়স্থল মাছের বাজারেও করের থাবা পড়েছে। বিদেশ থেকে আমদানি করা পাঙাশ মাছের ফিলেটের ওপর ২০% সম্পূরক শুল্ক এবং হিমায়িত মাছ আমদানিতে ১৫% ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত যারা বাজারে গিয়ে বড় ইলিশ বা রুই মাছ কেনার সাহস পান না, তারা সামুদ্রিক বা আমদানি করা হিমায়িত মাছ দিয়ে কোনোমতে প্রোটিনের চাহিদা মেটাতেন। এখন দেশীয় মাছের চাষীদের সুরক্ষার অজুহাতে এই কর বসানো হলেও, এর ফলে দেশি মাছের বাজারেও এক ধরনের কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে। কারণ যখনই আমদানিকৃত বিকল্প মাছের দাম বাড়বে, দেশি মাছের সিন্ডিকেটও রাতারাতি তাদের পাঙাশ, তেলাপিয়া আর চাষের রুইয়ের দাম বাড়িয়ে দেবে।
সবচেয়ে মারাত্মক এবং বহুল আলোচিত বিষয় হলো আমাদের দেশের বাজার সিন্ডিকেটের কার্যপ্রণালী এবং এই বাজেটের সাথে তার গভীর মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক। বাংলাদেশে সিন্ডিকেট কোনো কাল্পনিক শব্দ নয়, এটি একটি জীবন্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক সত্য। এই সিন্ডিকেট কীভাবে কাজ করে? এরা মূলত কয়েকটি স্তরে বিন্যস্ত। প্রথম স্তরে থাকেন গুটিকয়েক বড় আমদানিকারক বা মিল মালিক, যাদের আমরা ‘কার্টেল’ বলতে পারি। ধরুন, ভোজ্যতেল বা চিনির বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র ৪ থেকে ৫টি বড় গ্রুপ। তারা যখন দেখে যে সরকার বাজেটে কোনো পণ্যের কর কমিয়েছে, তখন তারা সরকারের সাথে বৈঠকে বসে প্রতিশ্রুতি দেয় যে দাম কমানো হবে। কিন্তু বাস্তবে তারা বাজারে সরবরাহের গতি ধীর করে দেয়। তারা মিল থেকে ডিলারদের পণ্য দেওয়া কমিয়ে দেয়, ফলে বাজারে একটি কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। পাইকারি বাজারে যখন ডিও (Delivery Order) বা স্লিপ হাতবদল হয়, তখন প্রতিটি স্তরে পণ্য ছাড়াই শুধু কাগজের দাম বাড়তে থাকে। কারওয়ান বাজার বা খাতুনগঞ্জের আড়তদারেরা তখন সাধারণ খুচরা বিক্রেতাদের বলেন, “মিল থেকে মাল দিচ্ছে না, আমাদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।” খুচরা বিক্রেতা নিরুপায় হয়ে তার এলাকার দোকানে বেশি দামে পণ্য তোলে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতা যখন এক লিটার তেল কিনতে যান, তখন তাকে সেই বর্ধিত মূল্যই দিতে হয়। অর্থমন্ত্রী যে কর ছাড়টি দিয়েছিলেন, তা মিল মালিক আর বড় ডিলারদের পকেটেই রয়ে গেল, সাধারণ মানুষের কপালে জুটল কেবল চড়া দামের হতাশা।
এই সিন্ডিকেটের পেছনে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার যে প্রশ্রয় থাকে, তা এখন ওপেন সিক্রেট। সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে বাজারে গিয়ে দুই-চারজন খুচরা দোকানিকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করে গণমাধ্যমে হেডলাইন হয়। কিন্তু যারা মূল হোতা, যারা কোল্ড স্টোরেজে লাখ লাখ টন আলু লুকিয়ে রাখছে, যারা চালের মিলগুলোতে হাজার হাজার টন ধান অবৈধভাবে মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, তাদের গায়ে হাত দেওয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর থাকে না। কারণ এই কর্পোরেট সিন্ডিকেটগুলোই বিভিন্ন উপায়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে অর্থায়ন করে এবং আমলাতন্ত্রের ওপর তাদের গভীর প্রভাব থাকে। এবারের বাজেটে এই সিন্ডিকেট দমনের জন্য কোনো কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের কোনো রূপরেখা নেই। উল্টো, কর ছাড়ের নামে তাদের আরও বেশি মুনাফা করার পরোক্ষ সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি, বিলাসদ্রব্য ও গাড়ি আমদানির ওপর কর বাড়ানোর যে সিদ্ধান্ত, তার মধ্যেও এক ধরণের বৈপরীত্য রয়েছে। ১২০০ থেকে ১৬০০ সিসি পর্যন্ত ব্যক্তিগত গাড়ির করভার বাড়িয়ে ১৫৫.৮৮% করা হয়েছে। আমাদের নীতিনির্ধারকেরা হয়তো ভাবেন যে গাড়ি মানেই বিলাসিতা। কিন্তু আজকের ঢাকা বা বড় শহরগুলোর গণপরিবহনের যে নারকীয় অবস্থা, সেখানে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য যাতায়াতের প্রয়োজনে একটি ছোট গাড়ি কেনা বিলাসিতা নয়, বরং একটি মৌলিক নিরাপত্তা ও প্রয়োজনের বিষয়। এই কর বৃদ্ধির ফলে সাধারণ চাকরিজীবী বা পেশাজীবীদের একটি গাড়ি কেনার স্বপ্ন চিরতরে শেষ হয়ে গেল। অথচ মজার বিষয় হলো, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং সংসদ সদস্যরা শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিলাসবহুল প্রাডো বা ল্যান্ডক্রুজার গাড়ি আমদানি করা অব্যাহত রাখবেন। এই বৈষম্যই প্রমাণ করে যে বাজেটের দর্শনটি আসলে কতটা জনবিচ্ছিন্ন। আমজনতার যাতায়াতের মাধ্যম যদি উন্নত না করে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর কর বাড়ানো হয়, তবে তা মধ্যবিত্তকে আরও বেশি অবদমিত করার শামিল। তবে এর ইতিবাচক দিক হলো ইলেকট্রিক গাড়ির (EV) ওপর কর কমানো, কিন্তু বাংলাদেশে এখনও ইভি চার্জিং স্টেশন বা পর্যাপ্ত অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে এই শুল্ক হ্রাসের সুবিধাও কেবল উচ্চবিত্তের একটি ক্ষুদ্র অংশই ভোগ করতে পারবে, যারা শখের বশে দ্বিতীয় বা তৃতীয় গাড়ি হিসেবে ইভি কিনবেন।

জাতীয় বাজেটের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো মূল্যস্ফীতি বা ইনফ্লেশন নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যমাত্রা ৭.৫ শতাংশে নির্ধারণ করা। গত কয়েক বছর ধরে দেশের বাস্তব মূল্যস্ফীতি ডাবল ডিজিট বা ১০ শতাংশের ওপরে ওঠানামা করছে। চাল, ডাল, আলু কিনতে গিয়ে মানুষের সাধারণ হিসাব বলছে যে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় গত দুই বছরে প্রায় ৫০% বেড়ে গেছে। এই অবস্থায় অর্থমন্ত্রী কীভাবে কোন জাদুমন্ত্রে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনবেন, তার কোনো বাস্তবসম্মত গাইডলাইন এই বাজেটে নেই। ব্যাংক খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণ আদায় কিংবা পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার ব্যাপারে বাজেট পুরোপুরি নীরব। যখন ব্যাংক খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি ঘটে এবং সেই ঘাটতি মেটাতে সরকারকে জনগণের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে ব্যাংকগুলোকে রি-ক্যাপিটালাইজ করতে হয়, তখন বুঝতে হবে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার প্রক্রিয়াটি কত সুদূরপ্রসারী। এবারের বাজেটেও ঘাটতি ধরা হয়েছে ২.৪৩ লাখ কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে হবে। সরকার যখন ব্যাংক থেকে সব টাকা ঋণ হিসেবে নিয়ে নেবে, তখন বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে যাবে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না হলে নতুন কলকারখানা গড়ে উঠবে না, ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে না। কর্মসংস্থান না থাকা এবং বাজারে নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতি এই দুইয়ের মাঝে পড়ে দেশের শিক্ষিত বেকার যুবসমাজ এক চরম হতাশার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
প্রস্তাবিত বাজেটের সামগ্রিক দর্শনটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি আসলে ধনীদের আরও ধনী করার এবং দরিদ্র ও মধ্যবিত্তকে আরও বেশি করের জালে বাঁধার একটি বার্ষিক দলিল। পরোক্ষ কর বা ভ্যাটের (VAT) ওপর সরকারের অতিমাত্রায় নির্ভরতাই এর প্রমাণ। একজন দিনমজুর যখন বাজার থেকে একটি সাবান বা এক প্যাকেট বিস্কুট কেনেন, তাকেও ১৫% ভ্যাট দিতে হয়; আবার দেশের শীর্ষ কোটিপতি যখন সেই একই সাবান কেনেন, তাকেও ১৫% ভ্যাট দিতে হয়। এই কর ব্যবস্থা কখনোই একটি গণতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী রাষ্ট্রের ভিত্তি হতে পারে না। প্রত্যক্ষ কর বা ধনীদের আয়ের ওপর কর বাড়ানোর পরিবর্তে সরকার সহজ পথ বেছে নিয়েছে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জিনিসের ওপর ভ্যাট বসানো। কারণ সাধারণ মানুষ কর ফাঁকি দিতে পারে না, বাজারে গেলেই তাকে ভ্যাট দিতেই হয়। অথচ দেশের হাজার হাজার কোটিপতি ও বড় ব্যবসায়ী ঠিকই বিভিন্ন ফাঁকফোকর গলে কর ফাঁকি দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন।

পরিশেষে, অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলতে চায়, এই ৯.৩৮ লাখ কোটি টাকার বাজেট সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের কোনো চাবিকাঠি নয়, বরং এটি একটি গাণিতিক মায়াজাল। বাজেটে পণ্যের দাম কমা বা বাড়ার যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, তা ততক্ষণ পর্যন্ত কাগজের পাতায় বন্দী থাকবে, যতক্ষণ না পর্যন্ত দেশের বাজার ব্যবস্থা থেকে রাজনৈতিক চত্রছায়ায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের শিকড় উপড়ে ফেলা যাবে। শুল্ক কমানোর সুফল যদি সাধারণ ভোক্তার পকেটে না পৌঁছায়, তবে এই বাজেটকে কোনোভাবেই সফল বা জনবান্ধব বলা যায় না। আগামী ৩০ জুন এই বাজেট চূড়ান্তভাবে পাস হবে। এই অন্তর্বর্তী সময়ে সংসদের ভেতরে ও বাইরে তীব্র জনমত গড়ে তুলতে হবে, যাতে কেবল কর্পোরেট ও আমলাদের স্বার্থ রক্ষা না করে, বাজেটে আমজনতার রান্নাঘরের বাস্তব স্বস্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। অন্যথায়, প্রতি বছরের মতো এবারও সাধারণ মানুষের কপালে জুটবে কেবলই আশ্বাসের বাণী আর শূন্য থলি নিয়ে বাজার থেকে ফেরার দীর্ঘশ্বাস। সিন্ডিকেটের এই মরণকামড় থেকে জনগণকে মুক্ত করতে না পারলে, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন কেবলই এক অলীক ফানুস হয়ে আকাশে উড়বে, যা মাটির মানুষের কোনো কাজেই আসবে না।

লেখক: মো: সাব্বির আহমেদ, নির্বাহী সম্পাদক, গণ আওয়াজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *