প্রতিবেদন: গণআওয়াজ
বিশ্ব রাজনীতি ও ক্ষমতার অন্দরমহলে এমন কিছু নাম থাকে, যাদের মৃত্যু ঘটলেও প্রভাব শেষ হয় না। জেফরি এপস্টেইন তেমনই এক নাম। ২০১৯ সালে কারাগারে রহস্যজনক মৃত্যুর পর অনেকেই ভেবেছিল—এই অধ্যায় বুঝি শেষ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (DOJ) এপস্টেইন সংক্রান্ত আরও ৩ মিলিয়নের বেশি নথি প্রকাশ করার পর সেই পুরনো প্রশ্ন আবার নতুন করে সামনে এসেছে,
কারা জড়িত ছিল?
কারা রক্ষা পেয়েছে?
এবং কেন সত্য এত বছর চাপা ছিল?
জেফরি এপস্টেইন ছিলেন একসময়ের প্রভাবশালী ধনকুবের, যিনি রাজনীতি, কর্পোরেট দুনিয়া, মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক অভিজাত সমাজের সঙ্গে গভীর যোগাযোগ বজায় রাখতেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে তিনি অভিযুক্ত হন অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন নির্যাতন, পাচার এবং একটি সংগঠিত যৌন অপরাধ নেটওয়ার্ক পরিচালনার জন্য।
এই অপরাধ শুধু ব্যক্তিগত বিকৃতি ছিল না, বরং এটি ইঙ্গিত দেয় এমন এক ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার, যেখানে অর্থ, প্রভাব ও পরিচয়ের জোরে দীর্ঘদিন আইনকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
সাম্প্রতিক প্রকাশিত এই নতুন ধাপে ৩০ লাখের বেশি পৃষ্ঠা নথি, ২ হাজারেরও বেশি ভিডিও, প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি, তদন্ত প্রতিবেদন, সাক্ষাৎকার ট্রান্সক্রিপ্ট, ইমেইল, ফ্লাইট লগ, আদালতের নথি – সব মিলিয়ে এটি এপস্টেইন কেসের সবচেয়ে বড় তথ্য উন্মোচন।
বিচার বিভাগ বলছে, এগুলো বহু বছর ধরে সংরক্ষিত ছিল এবং নতুন আইনি চাপ ও জনস্বার্থের কারণে প্রকাশ করা হয়েছে।
কেন এত দেরিতে এই প্রকাশ? এই প্রশ্নটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ ছিল শক্তিশালী ও প্রভাবশালী কিছু নামকে আড়াল করতেই এপস্টেইন ফাইল ধীরে ধীরে প্রকাশ করা হয়েছে। বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক ক্ষমতার মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য বোঝাপড়া কাজ করেছে। শেষ পর্যন্ত জনচাপ, গণমাধ্যমের অনুসন্ধান এবং কংগ্রেসীয় হস্তক্ষেপে সরকার বাধ্য হয় স্বচ্ছতা আইন অনুযায়ী এই বিশাল ডেটা প্রকাশ।
এই তথ্য প্রকাশের পর বিতর্ক আরো বাড়ছে। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিল ক্লিনটন-সহ অন্যান্য নাম আগেও নথিতে এসেছে এবং নতুন ফাইলেও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, কর্পোরেট নেতা, আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বদের নাম বিভিন্ন যোগাযোগ তালিকা ও ভ্রমণ রেকর্ডে এসেছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বরাবরের মতো বলেছেন যে এই নথিতে কোনো প্রমাণ-ভিত্তিক অপরাধের সমর্থন নেই। যদিও ইন্টারনেটে কিছু দাবিতে বলা হচ্ছে এসব ফাইল রাজনৈতিকভাবে হাতছাড়া হতে পারে । কিন্তু DOJ এর বক্তব্য হলো তারা আইনের সীমা ও ভিকটিমদের নিরাপত্তা দেখেই কাজ করছে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে, কোনো নাম থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়। অনেক ক্ষেত্রেই নথিগুলো কেবল যোগাযোগ বা পরিচয়ের ইঙ্গিত দেয়।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় তাহলে তদন্ত এগোলো না কেন? কেন অনেক ক্ষেত্রেই মামলা হয়নি?
এই নথিগুলোর বড় অংশে তথ্য রেড্যাক্ট (কালো করে ঢেকে) দেওয়া হয়েছে। বিচার বিভাগের যুক্তি, ভিকটিমদের পরিচয় রক্ষা ও চলমান বা সম্ভাব্য মামলার ক্ষতি না করার জন্য রেড্যাক্ট দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন “রেড্যাকশন কখনো কখনো সুরক্ষা নয়, বরং ক্ষমতাশালীদের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়।” এতে করে প্রশ্ন উঠছে, এই প্রকাশ কি সত্যিকারের স্বচ্ছতা, নাকি নিয়ন্ত্রিত সত্য?
এই তথ্য প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধীরা বলছে, এপস্টেইন কেস প্রমাণ করে আইন সবার জন্য সমান নয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ভিকটিমদের ন্যায়বিচার আজও অসম্পূর্ণ। সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ—এত বড় অপরাধের পরও কেন অনেকেই ধরাছোঁয়ার বাইরে?
এই প্রশ্নগুলো শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, এটি গ্লোবাল ক্ষমতা কাঠামোর ওপর আঘাত।
এই প্রতিবেদন শুধু একটি অপরাধ কাহিনি নয়। এটি আমাদের শেখায়, যেখানে ক্ষমতা বেশি, সেখানে নীরবতা দীর্ঘস্থায়ী হয়। আইন কাগজে সমান হলেও বাস্তবে তা প্রয়োগে শ্রেণি ও প্রভাব বড় ভূমিকা রাখে।
এই নথি প্রকাশ প্রমাণ করে, জনমত ও স্বাধীন সাংবাদিকতা ন্যায়বিচার এর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
জেফরি এপস্টেইন মারা গেছে, কিন্তু এপস্টেইন ফাইল জীবিত।
এই ফাইল আমাদের সামনে দাঁড় করায় এক অস্বস্তিকর সত্য, ক্ষমতার কাছে ন্যায় প্রায়ই দুর্বল হয়ে পড়ে। ৩ মিলিয়ন নথি প্রকাশের পরও যদি প্রকৃত দায়ীদের জবাবদিহি না হয়, তবে এই প্রকাশ কেবল ইতিহাসের আরেকটি দলিল হয়েই থাকবে, ন্যায়ের নয়, বরং ব্যর্থতার দলিল।
