বিশেষ প্রতিবেদক | গণ আওয়াজ
ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে প্রাথমিক সমঝোতা এবং হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের (ব্রেন্ট ক্রুড) দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৪ ডলার থেকে আকস্মিক ধস নেমে ৭৩ ডলারে নেমে এসেছে। বিশ্বজুড়ে যেখানে ভোক্তারা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন, সেখানে বাংলাদেশের বাজারে আপাতত তেলের দাম কমানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি)। একদিকে দাম না কমানোর এই অনমনীয় অবস্থান, অন্যদিকে চট্টগ্রামে ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নিজস্ব স্থায়ী ভবন উদ্বোধনের ঠিক আগমুহূর্তে বিপিসির প্রধান কার্যালয় ঢাকায় স্থানান্তরের প্রশাসনিক তোড়জোড় এই দুই ইস্যুতে দেশের জ্বালানি ও অর্থনৈতিক খাতে নতুন বিতর্ক ও চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববাজারে ধস, কিন্তু দেশে কেন কমছে না?
গত ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে যখন দাম চূড়ায় ছিল, তখন ৩০ হাজার টনের একটি ডিজেলবাহী জাহাজের জন্য সরকারকে গুনতে হয়েছিল প্রায় ৫ কোটি ডলার, যা বর্তমানে কমে ৩ কোটি ডলারে নেমে এসেছে।
তাহলে দেশের বাজারে দাম কমছে না কেন? বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিগত চার মাসে বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রি করার কারণে সরকারকে ১৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি লোকসান দিতে হয়েছে। যদিও বর্তমানে অকটেন বিক্রিতে কিছুটা লাভ হচ্ছে এবং ডিজেলের লোকসান কমে এসেছে, তবুও পূর্বের বিশাল ঘাটতি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সরকার দাম কমানোর ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিপিসি যখন লাভ করে তখন তার লভ্যাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হয় বা নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা থাকে (যা বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা)। কিন্তু বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেই সাথে সাথে দেশে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়, অথচ দাম কমলে ‘পূর্বের লোকসান সমন্বয়’-এর অজুহাতে ভোক্তাদের বঞ্চিত করা হয়। এটি একটি একমুখী ও অযৌক্তিক নীতি, যা দেশের সাধারণ মানুষের ওপর মুদ্রাস্ফীতির চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিপিসি সদর দপ্তর স্থানান্তর: প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের উল্টো রথ
জ্বালানি তেলের দামের পাশাপাশি বর্তমানে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে বিপিসির প্রধান কার্যালয় বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম থেকে প্রশাসনিক রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করার উদ্যোগ নিয়ে।
আইনি বাধ্যবাধকতা: বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন আইন, ২০১৬-এর ৫(১) ধারা অনুযায়ী বিপিসির প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে থাকা বাধ্যতামূলক। ফলে এটি ঢাকায় নিতে হলে আইন সংশোধন করতে হবে।
স্থানান্তরের পক্ষে বিপিসির যুক্তি:
বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে সদর দপ্তর ঢাকায় নেওয়ার জোর সুপারিশ করেছেন। তাদের মূল যুক্তিগুলো হলো:
১. বিপিসি এবং এর আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার ২৩৩ কোটি টাকার আর্থিক মূল্যের ১,৪০৯টি অডিট আপত্তি ঝুলে আছে। অডিট অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় ঢাকায় হওয়ায় সেখানে কার্যালয় থাকলে দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব।
২. নীতিনির্ধারণী বৈঠক ও বিদেশি সরবরাহকারীদের সাথে যোগাযোগের জন্য কর্মকর্তাদের মাসের অধিকাংশ সময় ঢাকায় থাকতে হয়।
বিপিসির মূল অবকাঠামো ও অপারেশন্স (চট্টগ্রাম)
├── তেলবাহী জাহাজ থেকে পণ্য গ্রহণ ও পরিমাপ
├── ইস্টার্ন রিফাইনারি (তেল শোধন) ও প্রধান প্রধান স্টোরেজ ট্যাংক
└── কাস্টম হাউসে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও নাগরিক মহলের ক্ষোভ:
চট্টগ্রামের সচেতন মহল ও ব্যবসায়ী সমাজ এই সিদ্ধান্তকে চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক গুরুত্বকে খাটো করার একটি আমলাতান্ত্রিক চক্রান্ত হিসেবে দেখছেন। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মতে, চট্টগ্রামের সার্সন রোডে সরকারি অর্থায়নে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বিপিসির একটি আধুনিক বহুতল ভবন নির্মাণ শেষ পর্যায়ে, যা আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে উদ্বোধনের কথা। এই অবস্থায় ভবনটি ফেলে ঢাকায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
তাছাড়া, দেশের তেল আমদানি, পরিশোধন (ইস্টার্ন রিফাইনারি), প্রধান প্রধান ট্যাংক ও সরবরাহ ব্যবস্থার মূল কেন্দ্রই হলো চট্টগ্রাম। মূল অপারেশনাল কাজের ক্ষেত্র থেকে নীতিনির্ধারকদের দূরে সরিয়ে নিলে তদারকিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। যদিও সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এর আগে আশ্বস্ত করেছিলেন যে বিপিসি চট্টগ্রামেই থাকবে, তবে সংসদের একটি বিশেষ নোটিশের পর আমলাতন্ত্রের ‘বিদ্যুৎ গতির’ ফাইল চালাচালি চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের বিস্মিত করেছে।
বিপিসির এই দুটি সিদ্ধান্তই মূলত আমলাতান্ত্রিক সুবিধা ও রাজস্ব সুরক্ষার দিকে নজর রেখে নেওয়া, যেখানে জনস্বার্থ এবং প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের জাতীয় নীতি উপেক্ষিত। বিশ্ববাজারের সুফল দেশের বাজারে না দেওয়া এবং চট্টগ্রামের অবকাঠামো প্রস্তুত থাকা সত্ত্বেও ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা সুশাসনের পরিপন্থী। জ্বালানি খাতের সংস্কার চাইলে বিপিসিকে শুধু নিজেদের লোকসান গোছালে চলবে না, সাধারণ ভোক্তার পকেটের স্বস্তি এবং আঞ্চলিক সমতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে।
