বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদা: সৎ করদাতাদের পিঠে চাবুক, নাকি অর্থনীতির বাধ্যবাধকতা?

শেয়ার করুন


বিশেষ প্রতিবেদন | গণ আওয়াজ


জাতীয় অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় সম্প্রতি ঘোষিত নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট। প্রতিবারের মতো এবারও বাজেট পেশের পর থেকে একটি সুনির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে নানামুখী বিতর্ক ও সমালোচনা দেশের অর্থনীতিবিদ ও সচেতন মহলে ঝড় তুলেছে। বিষয়টি হলো নির্দিষ্ট পরিমাণ কর দিয়ে ‘বিনা প্রশ্নে’ অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ। সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি বিশেষ বাধ্যবাধকতা হিসেবে দাবি করা হলেও, অর্থনীতিবিদ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা একে দেখছেন অনৈতিক এবং সৎ করদাতাদের জন্য চরম বৈষম্যমূলক একটি পদক্ষেপ হিসেবে। দেশের অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি নিয়ে একটি নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।

সরকারের যুক্তি: সংকটে রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশল

বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দেশ এক ধরনের ডলার সংকট এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় সরকারের বড় লক্ষ্য হলো অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো এবং দেশের টাকা দেশেই রাখা। সরকারের নীতিনির্ধারকদের যুক্তি অনুযায়ী, বাজারে বিশাল অঙ্কের অপ্রদর্শিত অর্থ অলস পড়ে আছে কিংবা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। এই অর্থকে যদি করের আওতায় এনে মূল অর্থনৈতিক স্রোতে যুক্ত করা না যায়, তবে রাষ্ট্র একটি বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে। ১৫ শতাংশ কর দিয়ে বিনা প্রশ্নে এই টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার পেছনে মূল উদ্দেশ্য হলো আবাসন খাত, পুঁজিবাজার এবং শিল্প উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো। সরকারের মতে, এটি কোনো স্থায়ী নীতি নয়, বরং বর্তমান সংকটকালীন অর্থনীতিকে গতিশীল করার একটি সাময়িক কৌশল মাত্র।

অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ: সৎ করদাতাদের অবমূল্যায়ন

সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা সংস্থাগুলো। তাদের মূল আপত্তি করের হারের বৈষম্য নিয়ে। যেখানে একজন সাধারণ ও সৎ করদাতাকে তার আয়ের ওপর সর্বোচ্চ ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত আয়কর দিতে হয়, সেখানে কালো টাকার মালিকরা মাত্র ১৫ শতাংশ কর দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন। এটি কর সংস্কৃতির ওপর একটি বড় আঘাত। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই সুযোগ দেওয়ার ফলে সৎ করদাতারা মানসিকভাবে চরম নিরুৎসাহিত হবেন। তারা ভাববেন, সময়মতো সঠিকভাবে কর দেওয়ার চেয়ে কর ফাঁকি দিয়ে পরবর্তীতে কম হারে কর দিয়ে টাকা বৈধ করাই লাভজনক। দীর্ঘমেয়াদে এই নীতি দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা আরও বাড়িয়ে তুলবে, যা সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থার জন্য আত্মঘাতী।

টিআইবি’র অবস্থান: অনৈতিকতা ও সুশাসনের সংকট

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে একে সম্পূর্ণ অনৈতিক এবং সংবিধানের অবমাননা হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। সংস্থাটির মতে, বারবার এই ধরনের সুযোগ দেওয়া দুর্নীতিবাজ ও অর্থ পাচারকারীদের পুরস্কৃত করার শামিল। বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) স্বাধীন কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, কারণ টাকার উৎস নিয়ে কোনো সংস্থা আইনি প্রশ্ন তুলতে পারবে না— এমন ধারা দেশের সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পরিপন্থী। টিআইবি মনে করে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে করখেলাপি ও কালো টাকার মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে, উল্টো তাদের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, যা সাধারণ নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান কোন পথে?

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বিশেষ সুযোগ দিয়ে দেশের অর্থনীতিতে সুফল আনা সম্ভব নয়, যদি না কর প্রশাসনের ভেতরে কাঠামোগত সংস্কার করা হয়। কালো টাকা সাদা করার সাময়িক সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি যারা কর ফাঁকি দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করার জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো জরুরি। ব্যাংক খাত এবং আবাসন খাতে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে যেন অবৈধ আয়ের পথগুলো শুরুতেই বন্ধ করা যায়। একটি দেশের টেকসই অর্থনীতির জন্য রাজস্ব বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা যেমন সত্য, তেমনি করদাতাদের মধ্যে সততা ধরে রাখার জন্য সুশাসন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের উচিত হবে কেবল রাজস্বের দিকে না তাকিয়ে, সৎ করদাতাদের স্বার্থ রক্ষা করে একটি সুষম ও ন্যায়সংগত অর্থনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *