বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডর একান্ন বছর

শেয়ার করুন

একটি জাতির প্রতিষ্ঠাকে সাধারণত তার সবচেয়ে টেকসই বা ধ্রুবক ইতিহাস হিসেবে মনে রাখা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের স্থপতি সেই সৌভাগ্য পাননি। নিজের তৈরি করা স্বাধীন দেশের সেনাবাহিনীর হাতে, নিজ বাসভবনেই তাঁকে জীবন দিতে হয়েছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার মাত্র চার বছরের মাথায়।


১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের প্রথম প্রহরে যা ঘটেছিল তা বুঝতে হলে, তার পেছনের পটভূমি অনুধাবন করা জরুরি। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। নতুন স্বাধীন দেশের একক সত্তা ও ‘বঙ্গবন্ধু’ হিসেবে আবির্ভূত হন তিনি। কিন্তু স্বাধীনতার পরবর্তী বছরগুলো ছিল অত্যন্ত কঠিন দুর্ভিক্ষ, তীব্র অর্থনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যের টানাপোড়েন। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে শেখ মুজিব দেশের শাসনব্যবস্থাকে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল)-এর অধীনে একদলীয় ব্যবস্থায় রূপান্তর করেন, যা স্বাধীনতার পর থেকে চলে আসা বহুদলীয় ব্যবস্থার সমাপ্তি ঘটায়। সেই সময় এবং পরবর্তীতে সমালোচকরা তাঁর তৎকালীন প্রশাসনকে ক্রমবর্ধিত কর্তৃত্ববাদী হিসেবে বর্ণনা করেছেন যা সর্বসম্মত কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং ঐতিহাসিক বিতর্কের একটি অংশ হিসেবেই রয়ে গেছে। এই পদক্ষেপটি বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর তীব্র প্রতিবাদের মুখমুখী হয়। অধিকাংশ ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ মতে, এটি তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র তৈরিতে ইন্ধন যুগিয়েছিল, যদিও সেই ষড়যন্ত্রের পূর্ণাঙ্গ রূপ কিংবা কোনো রাজনৈতিক বা বৈদেশিকের পরোক্ষ ভূমিকা ছিল কি না, তা আজও চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।
তবে এরপর কী ঘটেছিল তা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এটি কোনো তথ্য সংগ্রহ বা চলমান অনুসন্ধানের ফলাফল নয়, বরং যাচাইকৃত গৌণ ও বিশ্বকোষীয় উৎসের ভিত্তিতে প্রস্তুতকৃত একটি ঐতিহাসিক পর্যালোচনা। ষড়যন্ত্রের সূচনা নিয়ে যেখানে তথ্য অপর্যাপ্ত বা বিতর্কিত বিশেষ করে ক্ষমতার নেপথ্য যোগসূত্রগুলোর ক্ষেত্রে সেখানে কাল্পনিক নিশ্চয়তা দেওয়ার বদলে বিষয়টিকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৫ আগস্টের ভোরের আলো ফোটার আগেই নিস্তব্ধ ঢাকার রাজপথ চিরে কয়েকটি ট্যাংক ৩২ নম্বর ধানমন্ডির শেখ মুজিবের বাসভবনের দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত নিরাপত্তা দলের তদারকিতে ছিলেন তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার নুরুল ইসলাম খান। বাড়ির ভেতরের সবাই তখন ঘুমিয়ে – শেখ মুজিব, তাঁর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল ও ১০ বছরের শেখ রাসেল, দুই পুত্রবধূ সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল এবং ভাই শেখ নাসের। ট্যাংকগুলো সড়কের মুখে অবস্থান নেয় এবং কিছু গাড়ি মূল ফটকের দিকে অগ্রসর হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই গুলির শব্দে জানালার কাঁচ চুরমার হয়ে যায়।
ঘাতকরা ছিল মধ্যম সারির সামরিক কর্মকর্তা যাদের মধ্যে ছিলেন ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ, মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান, মেজর খন্দকার আবদুর রশীদ এবং মেজর শরিফুল হক ডালিম। ফার্স্ট বেঙ্গল ল্যান্সার্স এবং সেকেন্ড ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টের সৈনিকদের তারা নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শেখ মুজিবকে একটি স্টেন সাবমেশিন গান দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়; পরিবারের অন্যান্য সদস্য ও কর্মীদের ওপর ক্ষুদ্রাস্ত্র এবং কিছু বিবরণ অনুযায়ী আর্টিলারি শেল ব্যবহার করা হয়। ক্ষতির পরিমাপ ছিল অকল্পনীয়: শেখ মুজিব, তাঁর স্ত্রী, তিন পুত্র, দুই পুত্রবধূ এবং তাঁর ভাই সেদিন সেই বাড়ির ভেতরেই প্রাণ হারান। পৃথকভাবে, একই রাতে এক সমন্বিত হামলায় তাঁর ভাগ্নে ও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মনি এবং তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী নিহত হন। একই সাথে হত্যা করা হয় তাঁর ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত এবং তাঁর বেশ কয়েকজন সন্তানকে যাদের মধ্যে ১৯ বছরের এক কন্যা এবং ১১ বছরের এক পুত্রও ছিল। এই হামলায় মোট মৃতের সংখ্যা ৪৫ ছাড়িয়ে যায়, যাদের অধিকাংশই ছিলেন সাধারণ বেসামরিক মানুষ এবং অনেকেই আহত হন। শেখ মুজিবের দুই কন্যা, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা, সে সময় পশ্চিম জার্মানিতে (কিছু সূত্রে ব্রাসেলস) অবস্থান করার কারণে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। পরবর্তী বহু বছর তাঁদের দেশে ফেরায় নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল।


এই ঘটনার গভীরতর অধ্যায়টি কেবল এই হত্যাকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ছড়িয়ে আছে যা আগামী কয়েক দশকের জন্য বাংলাদেশের রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করেছিল। শেখ মুজিবের তৎকালীন মন্ত্রিসভার সদস্য খন্দকার মোশতাক আহমেদ ক্যু পরিচালনাকারী কর্মকর্তাদের সমর্থনে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ক্ষমতার মসনদে বসেন এবং তাদের ‘সূর্যসন্তান’ হিসেবে প্রশংসা করেন। সামরিক শাসনের অধীনে মোশতাক সরকার ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে, যা ঘাতকদের বিচার থেকে আইনি সুরক্ষা দেয়। এই আইনি ঢালটি দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বলবৎ ছিল। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল হয় এবং আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ঘটনার দীর্ঘ ৩৪ বছর পর, ২০০৯ সালে আদালত চূড়ান্ত রায় প্রদান করেন এবং ২০১০ সালে দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মকর্তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে দুজন এখনো বিদেশে পলাতক রয়েছেন যা এই ঘটনার এক অসামাপ্ত অধ্যায়। কাকতালীয়ভাবে, অর্ধশতক পর যা হাসিনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথেও এক ধরণের প্রতিধ্বনি তৈরি করে।


১৯৭৫ সালের আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াগুলো এই ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া সেই বিভাজনকেই ফুটিয়ে তুলেছিল। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কালো দিন হিসেবে অভিহিত করেন। এছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুগোশ্লাভিয়া এবং জাতিসংঘ থেকে শোকবার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন: হত্যাকাণ্ডের পরদিন ‘দ্য বাংলাদেশ অবজারভার’-এর সম্পাদকীয়তে এটিকে “ঐতিহাসিক প্রয়োজন” হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয় যা নতুন শাসকগোষ্ঠীর মনোভাবকেই প্রকাশ করছিল। অপরদিকে ব্রিটিশ প্রেসসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানানো হয়। রাষ্ট্র যেভাবে ঘটনাটিকে তুলে ধরতে চেয়েছিল আর বহির্বিশ্ব যেভাবে এটিকে দেখেছিল এই দুইয়ের মধ্যকার ব্যবধানই প্রমাণ করে যে, দাফন সম্পন্ন হওয়ার আগেই শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ঐতিহ্য কতটা বিতর্কিত হয়ে উঠেছিল।


বাংলাদেশের জন্য ১৫ আগস্টের গুরুত্ব কতটা বিস্তৃত, তা পরিমাপ করা কঠিন এবং ষড়যন্ত্রের পেছনের আসল কারিগর কারা ছিল তা নিয়ে অস্পষ্টতা থাকলেও এর সামগ্রিক প্রভাব নিয়ে তেমন দ্বিমত নেই। এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সামরিক ক্যু, তবে শেষ নয় এর মাত্র কয়েক মাসের মাথায় নভেম্বরে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের হত্যাকাণ্ডসহ আরও সহিংসতা ও পাল্টা ক্যু ঘটে। এটি দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার চূড়ান্ত ফয়সালাকারী হিসেবে সেনাবাহিনীকে প্রতিষ্ঠিত করার এক নতুন নজির তৈরি করে। আর এটি এমন এক ক্ষত তৈরি করেছিল যা কখনোই পুরোপুরি মেলেনি: পরবর্তী সরকারগুলো ১৫ আগস্টকে একেকভাবে ব্যবহার করেছে। ১৯৯৬ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকার এটিকে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালন করলেও, বিরোধী দলগুলোর শাসনকালে এই দিনের সরকারি স্বীকৃতি বারবার বিতর্কিত ও পরিবর্তিত হয়েছে।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও, এই চক্রান্তের পূর্ণাঙ্গ নেপথ্য রূপরেখা কারা এর নির্দেশক ছিল, কারা অর্থায়ন করেছিল, কিংবা ঘাতক কর্মকর্তাদের পেছনে কোনো রাজনৈতিক বা বৈদেশিকের পরোক্ষ হাত ছিল কি না তা একজন বাংলাদেশী ইতিহাসবিদের ভাষায়, “প্রমাণের চেয়ে ধারণার ওপরই বেশি টিকে আছে।” তবে এর চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই – একটি জাতির প্রতিষ্ঠাতা, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তাঁরই গড়ে তোলা সেনাবাহিনীর হাতে নিজ গৃহে নিহত হয়েছেন। আর সেই জাতির রাজনৈতিক সংস্কৃতি গত একান্ন বছর ধরে এই হত্যাকাণ্ডের অর্থ ও প্রভাব নিয়ে বিতর্ক করে চলেছে, কিন্তু এর মূল কারণ নিয়ে কখনো পুরোপুরি একমত হতে পারেনি।


হয়তো ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫-এর আসল উত্তরাধিকার এটাই এটি কেবল অতীতে থমকে যাওয়া কোনো ট্র্যাজেডি নয়, বরং এক রাজনৈতিক বাস্তবতা। বাংলাদেশ আজও তার প্রতিষ্ঠাতাদের পরিচয়, তাঁদের বিশ্বাসের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা এবং কারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী তা নিয়ে বিতর্ক থেকে বের হতে পারেনি। অর্ধশতক পরেও, এ দেশের রাজনীতি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এমন এক রাতের ঘটনা নিয়ে তর্ক করে চলেছে, যা বর্তমান অধিকাংশ নাগরিকের জন্মের আগেই শেষ হয়ে গেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *