গণআওয়াজ ডেস্ক
উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জামায়াতের দাপট, ঢাকার ৬ আসনে জয় আর তরুণ ভোটারদের ‘মাস্টারস্ট্রোক’—বিশ্লেষণধর্মী বিশেষ রিপোর্ট।
বগুড়া থেকে ঢাকা, সাতক্ষীরা থেকে মেহেরপুর—ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফল যেন এক বিরাট রাজনৈতিক বিস্ফোরণ! নিজস্ব শক্তিতে লড়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যে চমক দেখিয়েছে, তা দেশের সংসদীয় রাজনীতির প্রচলিত সমস্ত ব্যাকরণ পাল্টে দিয়েছে। ১৯৯৬ সালে যেখানে ছিল মাত্র ৩টি আসন, ২০২৬-এ সেই জামায়াতই এককভাবে ৬৮ আসনে জয়ী হয়ে দেশের ইতিহাসে প্রথমবার প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে। কিন্তু সাফল্যের এই ভিড়েও কেন হারলেন দলের সেক্রেটারি জেনারেলসহ শীর্ষ নেতারা? কীভাবে রাজধানীর বুকে ৬টি আসন ছিনিয়ে নিয়ে ইতিহাস গড়ল দলটি? কেবল প্রবীণ ভোটার নয়, বরং জেন-জি (Gen-Z) প্রজন্মের নতুন মেরুকরণ আর উত্তরবঙ্গের ভোটব্যাংক কীভাবে এই ঐতিহাসিক উত্থানের কারিগর হলো—চলুন দেখে নিই সেই রুদ্ধশ্বাস বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে, তা দেশের সংসদীয় রাজনীতির প্রচলিত হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে। এবারের নির্বাচনে জামায়াত এককভাবে ৬৮টি আসনে জয়লাভ করেছে, যা দলটির ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। শরিক দলগুলোর আসনসহ তাদের মোট আসন সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭। যদিও তারা সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যা স্পর্শ করতে পারেনি, তবে বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী আগামী জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে দলটি।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৯১ সালে ১৮টি এবং ২০০১ সালে ১৭টি আসনে জয় পেয়েছিল জামায়াত। ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে দলটির আসন সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৩টি ও মাত্র ২টি। সেই তুলনায় এবারের ৬৮টি আসনে একক জয় দলটির জন্য একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘ দেড় দশক পর বিএনপির সাথে কোনো জোট ছাড়াই সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এই সাফল্য পাওয়া রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
জামায়াতের এই সাফল্যের মূল ভিত্তি ছিল দেশের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। বিশেষ করে খুলনা বিভাগে তাদের দাপট ছিল প্রশ্নাতীত। এই বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টিতেই জয় পেয়েছে জামায়াত। এর মধ্যে সাতক্ষীরা, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা জেলার সবকটি আসনে তাদের প্রার্থীরা নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছেন। এছাড়া রংপুর ও রাজশাহী বিভাগেও দলটি বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করেছে। রংপুরের ৩৩টি আসনের মধ্যে ১৬টি এবং রাজশাহীর ৩৯টি আসনের মধ্যে ১১টিতে তারা জয়ী হয়েছে। কুড়িগ্রাম ও রংপুরের সবকটি আসনে জোটগতভাবে জয় নিশ্চিত করাও দলটির মাঠ পর্যায়ের সাংগঠনিক শক্তির প্রমাণ দেয়।
সবচেয়ে বড় চমক ছিল রাজধানী ঢাকা মহানগরে। অতীতে ঢাকার রাজনীতিতে জামায়াতের সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব না থাকলেও এবার তারা ঢাকা মহানগরের ১৫টি আসনের মধ্যে ৬টিতে সরাসরি জয় পেয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা-৪, ৫, ১২, ১৪, ১৫ ও ১৬ আসনগুলো অন্যতম। এছাড়া তাদের জোটের শরিক এনসিপি প্রার্থী ঢাকা-১১ আসনে জয়লাভ করেছেন। রাজধানীর আরও পাঁচটি আসনে (ঢাকা-৭, ৮, ১০, ১৩ ও ১৭) তারা সামান্য ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজধানীর এই ফলাফল জামায়াতের জন্য একটি মাইলফলক, যা দলটিকে জাতীয় রাজনীতির মূল ধারায় আরও শক্তিশালী অবস্থান দিয়েছে।
নির্বাচনী বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই উত্থানের পেছনে কয়েকটি বিশেষ দিক কাজ করেছে। প্রথমত, তরুণ ও নারী ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এবার জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাম্প্রতিক সাফল্য এই পরিবর্তনের একটি বড় ইঙ্গিত ছিল। এছাড়া গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী তরুণদের নতুন দল এনসিপির সঙ্গে তাদের নির্বাচনী জোট এক নতুন কৌশলগত সমীকরণ তৈরি করেছে। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিমের মতে, জামায়াত নিজেদের রক্ষণশীল ডানপন্থী অবস্থান থেকে সরিয়ে মধ্য-ডানপন্থী দল হিসেবে তুলে ধরতে সচেষ্ট হয়েছে।
বিশ্লেষণ বলছে, আগে যে ভোটগুলোকে বিএনপির একক আমানত মনে করা হতো, এবার জামায়াত সেই জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী ঘরানার ভোটে বড় ধরনের ভাগ বসাতে সক্ষম হয়েছে। দলটি নিজেদের ‘ক্ষমতামুখী নয়, বরং পরিবর্তনের শক্তি’ হিসেবে প্রচার করায় তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের একটি বড় অংশ আকৃষ্ট হয়েছে। তবে এই সাফল্যের মাঝেও দলটির জন্য কিছু বড় ধাক্কা ছিল। জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান জয় পেলেও হেরে গেছেন সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ অনেক হেভিওয়েট প্রার্থী। জামায়াত নেতাদের একাংশের দাবি, তাদের অন্তত ৩০টি আসনে সূক্ষ্ম কারচুপির মাধ্যমে ফলাফল পরিবর্তন করা হয়েছে, যা নিয়ে তারা আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
জামায়াতের এই উত্থানকে ভিন্নভাবে দেখছে দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দল বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতে, দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসন এবং গণতন্ত্রের অনুপস্থিতির ফলেই মানুষের মধ্যে এক ধরনের উগ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। তিনি মনে করেন, মানুষের কণ্ঠ রোধ করার ফলে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, জামায়াত সেই সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে। তবে কারণ যা-ই হোক, বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতের এই নতুন অবস্থান উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বিরোধী দলের আসনে বসে জামায়াত আগামী সংসদে কতটা কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারবে, তা এখন দেখার বিষয়। একদিকে বিএনপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা, অন্যদিকে জামায়াতের শক্তিশালী বিরোধী অবস্থান—এই দ্বিমুখী সমীকরণ বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে নতুন কোনো মাত্রা যোগ করে কিনা, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। জামায়াত কি পারবে তাদের এই ভোট ব্যাংক ধরে রেখে সামনের দিনে আরও বড় শক্তিরূপে আবির্ভূত হতে, নাকি এটি কেবল একটি বিশেষ পরিস্থিতির ফসল? এই প্রশ্নের উত্তর সময়ের হাতে।
আপনার কি মনে হয়, জামায়াতের এই উত্থান কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন কোনো মেরুকরণের সংকেত দিচ্ছে? কমেন্টে জানান!
