রাফাহ সীমান্তে চোখ বেঁধে ফিলিস্তিনিদের জিজ্ঞাসাবাদ: মৃতদেহ নিয়েও নোংরা রাজনীতি ও জেনেভা কনভেনশনের চরম লঙ্ঘনে উত্তাল গাজা।
দীর্ঘ দুই বছর পর নিজ দেশে ফেরার স্বপ্ন নিয়ে মিশরের কায়রো থেকে রাফাহ সীমান্তের দিকে রওনা হয়েছিলেন হুদা আবু আবেদ। হৃদরোগী এই বৃদ্ধা ভেবেছিলেন, যুদ্ধবিরতির পর অন্তত নিজের ভিটায় শান্তিতে মরতে পারবেন। কিন্তু ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে পা রাখতেই তার সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। তাকে কেবল দীর্ঘক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখিই হতে হয়নি, বরং চোখ বেঁধে, হাতকড়া পরিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চালানো হয়েছে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। এটি কেবল হুদা আবু আবেদের গল্প নয়; রাফাহ সীমান্ত এখন ফিলিস্তিনিদের জন্য এক বিভীষিকার নাম, যেখানে জীবিতদের পাশাপাশি মৃতরাও রেহাই পাচ্ছে না ইসরায়েলি বর্বরতা থেকে।
ভেবেছিলেন দীর্ঘ দুই বছর পর নিজ মাতৃভূমিতে ফিরলে হয়তো শান্তি পাবেন, কিন্তু রাফাহ সীমান্তে পা রাখতেই ৫৭ বছর বয়সী হুদা আবু আবেদ বুঝতে পারলেন নরকের দরজা সবে খুলেছে। চোখ বেঁধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেরা, জিনিসপত্র লুট আর মেয়েকে মারধর—ফিলিস্তিনিদের জন্য এটিই এখন গাজা ফেরার করুণ বাস্তবতা। তবে বর্ববতা শুধু জীবিতদের ওপর নয়, রেহাই পাচ্ছে না কবরে থাকা মৃত আত্মারাও। একদিকে ইসরায়েলি সেনারা ফিলিস্তিনিদের কবরের ওপর দাঁড়িয়ে উল্লাস করে হিব্রু গান গাইছে, অন্যদিকে মেগিদ্দো কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বিনা চিকিৎসায় মরছে সুস্থ তরুণরা। আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গাজায় এখন যে নিষ্ঠুর খেলা চলছে, তার প্রতিটি পরত গা শিউরে ওঠার মতো। ঠিক কী ঘটছে এখন গাজা-মিশর সীমান্তে? কেন ফিরতে গিয়েও বন্দি হতে হচ্ছে সাধারণ নারীদের?
রাফাহ ক্রসিং আংশিকভাবে খুলে দেওয়ার পর প্রথম ধাপে গাজায় প্রবেশের অনুমতি পেয়েছিলেন মাত্র ১২ জন ফিলিস্তিনি, যার মধ্যে ৯ জনই নারী। তাদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে এক লোমহর্ষক চিত্র। সীমান্ত পার হওয়ার পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এবং তাদের মদদপুষ্ট মিলিশিয়া বাহিনী ফিলিস্তিনিদের গতিরোধ করে। হুদা আবু আবেদ জানান, ইউরোপীয় সীমান্ত পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিতেই তার নাতি-নাতনিদের জন্য কেনা খেলনা, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। এরপর তাকে একটি সামরিক ব্যারাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একজন নারী সেনা তাকে বিবস্ত্র করে তল্লাশি চালায় এবং পরবর্তীতে চোখ বেঁধে দীর্ঘ সময় ধরে জেরা করা হয়। “গাজার সব মানুষকে বলো, তোমাদের জিনিসপত্র গুছিয়ে বিদায় হও”—একজন ইসরায়েলি অফিসারের এই বাক্যটিই বলে দেয় তাদের মূল উদ্দেশ্য কী।
ইসরায়েলের এই নিষ্ঠুরতা কেবল সীমান্তের কাঁটাতারে সীমাবদ্ধ নেই, তা পৌঁছে গেছে ফিলিস্তিনিদের শেষ আশ্রয়স্থল কবরস্থানেও। সম্প্রতি উত্তর গাজার একটি কবরস্থান থেকে এক ইসরায়েলি জিম্মির দেহ উদ্ধারের পর সেখানে ইসরায়েলি সেনাদের হিব্রু গানে উল্লাস করতে দেখা গেছে। এই তথাকথিত ‘সাফল্য’ অর্জনে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে শত শত ফিলিস্তিনি কবর। স্বজনদের হাড়গোড় ও দেহাংশ এখন যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন ও জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী কবরস্থান একটি সুরক্ষিত স্থান হলেও ইসরায়েল ধারাবাহিকভাবে এই নিয়ম লঙ্ঘন করে চলেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, অন্তত ১৬টি কবরস্থান সম্পূর্ণ ধ্বংস করে সেখানে সামরিক ঘাঁটি গেড়েছে দখলদার বাহিনী। মৃতদের প্রতি এই চরম অবমাননা ফিলিস্তিনিদের জন্য এক গভীর মানসিক যাতনা এবং ‘কালেকটিভ পানিশমেন্ট’ বা সামষ্টিক শাস্তির নামান্তর।
ফিলিস্তিনিদের প্রতি এই বিদ্বেষের আরেকটি ভয়াবহ দিক ফুটে উঠেছে ইসরায়েলি কারাগারগুলোতে। ২০ বছর বয়সী তরুণ আহমেদ তাজাজা ছিলেন সম্পূর্ণ সুস্থ। কিন্তু মেগিদ্দো কারাগারে মাত্র আট মাস বন্দি থাকার পর তার লাশ হয়ে ফেরার খবর আসে। পরিবারের অভিযোগ, আহমেদকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়েছে এবং কুকুর দিয়ে কামড়ানো হয়েছে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। মানবাধিকার সংস্থা ‘বি’তসেলেম’ ইসরায়েলি কারাগারগুলোকে এখন ‘নির্যাতন শিবিরের নেটওয়ার্ক’ হিসেবে অভিহিত করছে। বর্তমানে অন্তত ১০১ জন বন্দি যথাযথ চিকিৎসার অভাবে সেখানে প্রাণ হারিয়েছেন। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, মৃত্যুর পরও এই মরদেহগুলো পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হচ্ছে না। এগুলোকে ‘দরকষাকষির হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করছে নেতানিয়াহু সরকার।
গাজায় চলমান এই মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেই নতুন করে হামলার খবর পাওয়া গেছে। গত শনিবার থেকে বুধবার পর্যন্ত গাজা সিটি, খান ইউনিস এবং মাওয়াসি এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় শিশুসহ অন্তত ৪৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় তথাকথিত যুদ্ধবিরতি চললেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রতিফলন নেই। এমনকি ত্রাণকর্মী ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও রেহাই পাচ্ছেন না। ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স’ (MSF) সম্প্রতি জানিয়েছে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ত্রাণকর্মীদের নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা দিচ্ছে না, যার ফলে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ছে। গাজায় এখন খাদ্যের চেয়েও বেশি অভাব দেখা দিয়েছে বেঁচে থাকার ন্যূনতম মর্যাদার।
বর্তমানে কায়রোতে প্রায় ৩০ হাজার ফিলিস্তিনি গাজায় ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছেন। কিন্তু ইসরায়েলি কঠোর কোটা অনুযায়ী, সবাইকে ফিরিয়ে নিতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। একদিকে নিজ ভূমিতে ফেরার আকুতি, অন্যদিকে ফেরার পথে অমানবিক নির্যাতন—এই দুই যাতাকলে পিষ্ট ফিলিস্তিনি জনপদ। আন্তর্জাতিক মহলের নীরবতা এই অপরাধগুলোকে আরও বৈধতা দিচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের কাছে এখন একটিই প্রশ্ন: জীবিত অবস্থায় নিপীড়ন আর মৃত্যুর পর কবরের অবমাননা—এই নরক থেকে মুক্তির পথ কোথায়? বিশ্ববিবেক কি কেবল ইসরায়েলি বন্দিদের মুক্তির গল্পেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বিধ্বস্ত কবরস্থানে স্বজনের হাড় খুঁজে বেড়ানো ফিলিস্তিনি মায়ের চোখের জলও দেখবে?
গাজার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আমাদের করণীয় কি? কমেন্টে জানান!
