বিশেষ প্রতিনিধি | গণ আওয়াজ
বাংলাদেশি গবেষকদের আন্তর্জাতিক মানের ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার (Retraction) করেছে বিভিন্ন বিখ্যাত আন্তর্জাতিক একাডেমিক প্রকাশনা ও জার্নাল সংস্থা। পিয়ার-রিভিউ বা পর্যালোচনায় নানা ধরনের জালিয়াতি, তথ্য বিকৃতি, নকল (Plagiarism), এবং কৃত্রিম উপায়ে সাইটেশন (Citation) বাড়ানোর প্রমাণ পাওয়ায় এসব গবেষণাপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
সম্প্রতি উন্মোচিত এই ঘটনা দেশের উচ্চশিক্ষা এবং গবেষণা খাতের ভাবমূর্তি বড় ধরনের সংকটে ফেলেছে। প্রত্যাহার করা গবেষণাপত্রগুলোর তালিকায় দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় (NSU) সহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও গবেষকের নাম উঠে এসেছে।
কেন এবং কীভাবে প্রত্যাহার করা হলো?
আন্তর্জাতিক গবেষণা নজরদারিকারী ওয়েবসাইট ‘রিট্র্যাকশন ওয়াচ’ (Retraction Watch) এবং সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রত্যাহার করা এসব গবেষণাপত্রের প্রধান অভিযোগগুলো হলো:
- ডেটা জালিয়াতি ও তথ্য বিকৃতি: গবেষণার কাজে ব্যবহৃত প্রাথমিক তথ্যে অসচ্ছতা ও মনগড়া ফলাফল উপস্থাপন।
- ভুয়া পিয়ার-রিভিউ (Fake Peer-Review): প্রকাশনা দ্রুত করার উদ্দেশ্যে ভুয়া ইমেইল ও ভিয়া রিভিউ ব্যবস্থা তৈরি করা।
- সাইটেশন সিন্ডিকেট: পারস্পরিক সুবিধার্থে একে অপরের নাম ও গবেষণা অনৈতিকভাবে উদ্ধৃত (Cite) করা।
- প্লেজিয়ারিজম বা লেখা চুরি: পূর্ববর্তী অন্যান্য গবেষণার অংশবিশেষ অনুমতি বা ঋণস্বীকার ব্যতিরেকে সরাসরি ব্যবহার।
কাঠগড়ায় নামি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষক
তালিকায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের অন্যান্য প্রথম সারির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকজন স্বনামধন্য শিক্ষকের নাম জড়িয়ে পড়ায় একাডেমিক অঙ্গনে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্যেষ্ঠ একাডেমিক প্রতিনিধি জানান, “বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পদোন্নতি ও আর্থিক প্রণোদনার প্রধান শর্ত হিসেবে গবেষণাপত্রের সংখ্যাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। গুণগত মানের চেয়ে ‘সংখ্যার দৌড়’ বাড়াতে গিয়ে অনেকেই অনৈতিক পথ বেছে নিচ্ছেন, যার খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো দেশকে।”
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাবমূর্তির সংকট
শিক্ষাবিদদের মতে, এই ধরনের ঘটনা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশি গবেষকদের বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করবে। এর ফলে:
১. বিশ্বখ্যাত জার্নালগুলোতে সাধারণ বাংলাদেশি গবেষকদের মানসম্মত লেখাও বাড়তি সন্দেহের চোখে দেখা হতে পারে।
২. আন্তর্জাতিক গবেষণা তহবিল (Research Grants) পাওয়ার পথ কঠিন হয়ে পড়বে।
৩. বিশ্ব অর্থনীতি ও র্যাঙ্কিংয়ে দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থান আরও পিছিয়ে পড়বে।
প্রতিবাদের মুখে নীতিমালার দাবি
এ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা কমিশন ও সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন এবং দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সচেতন শিক্ষাবিদ সমাজ। সেই সাথে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শক্তিশালী ‘এথিক্স কমিটি’ গঠনের জোর সুপারিশ করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র (Sources):
১. Retraction Watch Database (আন্তর্জাতিক গবেষণা ট্র্যাকিং সংস্থা)
২. Elsevier, Springer Nature, Wiley সহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রকাশনীগুলোর অফিশিয়াল সাইটেশন ও নোটিশ
৩. নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত পাবলিক রেকর্ড ও একাডেমিক নোটিশ
