৪,৫০০ পণ্যে শুল্ক শূন্য: যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে রাজস্বে বড় চাপ

শেয়ার করুন

অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির কপি প্রকাশ্যে এসেছে, আর সেই কপির ভেতরে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজস্ব কাঠামো ও শিল্পনীতির জন্য বড় এক মোড় ঘোরানো বাস্তবতা। চুক্তি কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা সাড়ে চার হাজার শ্রেণির পণ্যে কাস্টমস শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে বাংলাদেশকে। আরও দুই হাজারের বেশি পণ্যে ধাপে ধাপে শুল্ক প্রত্যাহার করতে হবে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে। অর্থাৎ এটি শুধু একটি কূটনৈতিক চুক্তি নয়; এটি সরাসরি রাজস্ব ও বাজার কাঠামোয় গভীর প্রভাব ফেলবে।

তবে পুরো শুল্কব্যবস্থা একেবারে শূন্য হয়ে যাচ্ছে—এমনটা নয়। আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট, অগ্রিম কর ও অগ্রিম আয়কর বহাল থাকছে। কিন্তু সংখ্যাটা গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হওয়া পণ্যে যে রাজস্ব আদায় হয়, তার ৩৮ শতাংশ আসে আমদানি শুল্ক থেকে এবং বাকি ৬২ শতাংশ বিভিন্ন কর থেকে। গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ২৫০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। এ থেকে শুল্ক বাবদ ৭৬২ কোটি টাকা এবং অন্যান্য কর বাবদ ১,২২০ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। অর্থাৎ চুক্তি কার্যকর হলে এই শুল্ক অংশের বড় একটি অংশ ছাড় দিতে হবে—যা সরাসরি রাজস্বে চাপ সৃষ্টি করবে।

চুক্তির কাঠামো আরও স্পষ্ট করলে দেখা যায়, কিছু পণ্যে তাৎক্ষণিক শূন্য শুল্ক, কিছু পণ্যে প্রথম দিন থেকেই অর্ধেক কমানো, আর বাকি অংশ নির্দিষ্ট সময় ধরে ধাপে ধাপে কমিয়ে পঞ্চম বা দশম বছরে শূন্যে নামিয়ে আনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ইতোমধ্যে যেসব পণ্যে শুল্ক শূন্য, তা বহাল রাখতে হবে। আবার কিছু পণ্য ট্যারিফ শিডিউল অনুযায়ী আগের মতোই শুল্কযোগ্য থাকবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে কোনো ধরনের কোটা আরোপ করা যাবে না এবং অশুল্ক বাধাগুলোও সরিয়ে নিতে হবে। অর্থাৎ বাজার প্রতিযোগিতায় মার্কিন পণ্যের জন্য একটি উন্মুক্ত ও সমতল ক্ষেত্র নিশ্চিত করতে হবে বাংলাদেশকে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও কিছু সুবিধা দিয়েছে। বাংলাদেশের ১,৬৩৮ শ্রেণির পণ্য তাদের বাজারে পাল্টা শুল্ক ছাড়া প্রবেশের সুযোগ পাবে। বেতের তৈরি পণ্য, লৌহজাত দ্রব্য, খনিজ, ওষুধ, রাসায়নিক, প্লাস্টিক ও কাঠজাত নানা পণ্য এই তালিকায় রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাভাবিক এমএফএন শুল্ক বহাল থাকবে। তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে যদি যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করা হয়, তাহলে পাল্টা শুল্ক শূন্য হবে, কিন্তু স্বাভাবিক গড় শুল্ক ১৬ থেকে ১৭ শতাংশই দিতে হবে। অর্থাৎ সুবিধা আছে, তবে তা সীমিত এবং নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষ।

প্রশ্ন হলো, এই চুক্তি কি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি? সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এটি পূর্ণাঙ্গ মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নয়। আর বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার বিধান অনুযায়ী, যদি এটি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি হিসেবে স্বীকৃতি না পায়, তাহলে একই ধরনের সুবিধা অন্য দেশও দাবি করতে পারে। সেক্ষেত্রে আমদানি শুল্কে যে ছাড় যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া হচ্ছে, তা বহুগুণে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তখন রাজস্বের ওপর চাপ আরও বাড়বে, এবং দেশের নবীন ও সুরক্ষাপ্রাপ্ত শিল্পগুলো তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে।

এই চুক্তি তাই শুধু দুই দেশের বাণিজ্য বাড়ানোর বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের আর্থিক স্বনির্ভরতা, শিল্প সুরক্ষা ও রাজস্ব কাঠামোর ভারসাম্যের প্রশ্ন। একদিকে রপ্তানিতে কিছু নতুন দরজা খুলছে, অন্যদিকে আমদানিতে রাজস্ব ছাড় দিয়ে বাজার আরও উন্মুক্ত হচ্ছে। লাভ-ক্ষতির হিসাব কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তব অর্থনীতির মাটিতেই প্রমাণিত হবে। এখন দেখার বিষয়—এই উন্মুক্ততার পথে হাঁটতে গিয়ে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত, আর রাজস্ব ও স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষায় কী বিকল্প কৌশল নেয় সরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *