অনলাইন ডেক্স | গণ আওয়াজ
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক এক নতুন মোড় নিয়েছে। বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বৈঠকটি কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনীতি নয়, বরং দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক স্পষ্ট প্রতিফলন। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং ঝুলে থাকা মেগা-প্রজেক্টগুলোর গতি বাড়ানোর যে দাবি জানানো হয়েছে, তা একাধারে যেমন যৌক্তিক, তেমনই এর পেছনে রয়েছে গভীর অর্থনৈতিক উদ্বেগ।
রয়টার্সের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ চীনকে অনুরোধ করেছে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা কিংবা চামড়া ও পাটের মতো পণ্য বেশি পরিমাণে আমদানি করতে। সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক যে দেশের সাথে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের, সেখানে কৃষিপণ্য রপ্তানি করে সেই পাহাড়সম ঘাটতি কতটা কমানো সম্ভব?
চীন থেকে আমরা আমদানি করি ভারী যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক ও ইলেকট্রনিক্স, যার মূল্য আকাশচুম্বী। আর আমাদের প্রধান রপ্তানি পণ্য এখনো অনেক পিছিয়ে। এই কাঠামোগত বৈষম্য দূর করতে না পারলে শুধু মুখের কথায় বা শুল্কমুক্ত সুবিধার আশ্বাসে বাণিজ্য ঘাটতি কমবে না। বাংলাদেশকে তৈরি পোশাকের বাইরে গিয়ে ওষুধ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের বাজার ধরতে হবে, যা বেইজিংয়ের সদিচ্ছা ও নীতিগত ছাড় ছাড়া অসম্ভব।
বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই চীনের কাছে প্রায় ৬.২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ঋণে জর্জরিত। এর সাথে রয়েছে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (AIIB) আরও বড় অঙ্কের দায়। সাধারণ জনগণের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো এই বিশাল ঋণের প্রকল্পগুলো সময়মতো শেষ না হওয়া।
তিস্তা নদীর সমন্বিত মহাপরিকল্পনার মতো সংবেদনশীল ও বড় প্রকল্প নিয়ে চীন ‘সাধ্যমতো সহায়তার’ আশ্বাস দিলেও, মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন কত দ্রুত হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার কারণে চীন এখন আগের চেয়ে অনেক বুঝে-শুনে, হিসাব কষে ঋণ দিচ্ছে।
জনসাধারণের নজর এড়িয়ে যায়নি এই সফরের ভূ-রাজনৈতিক দিকটিও। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন এক জায়গায়, যেখানে আঞ্চলিক পরাশক্তিদের প্রভাব বিস্তারের একটা সুপ্ত প্রতিযোগিতা সব সময়ই থাকে। ঢাকার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই ভারসাম্য বজায় রাখা।
রয়টার্সের বিশ্লেষণে স্পষ্ট বলা হয়েছে, চীন এখন সেইসব দেশকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে যারা তাকে সরাসরি বাণিজ্যিক করিডোর সুবিধা দিতে পারে (যেমন মিয়ানমার বা মধ্য এশিয়া)। বাংলাদেশ সরাসরি সেই সুবিধা দিতে পারছে না বলেই বেইজিং ঢাকার বড় প্রকল্পে অর্থায়নে কিছুটা মন্থর গতি নীতি অবলম্বন করছে কি না এই প্রশ্ন এখন গদগদ বন্ধুত্বের আড়ালে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
চীনের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। তবে বেইজিংয়ের কাছ থেকে শুধু আশ্বাস আদায় করলেই চলবে না, মেগা প্রকল্পগুলোর দ্রুত ডেলিভারি নিশ্চিত করতে ঢাকাকে শক্ত দরকষাকষিতে যেতে হবে। অন্যথায়, একের পর এক ঋণের চুক্তি দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে আরও বেশি পরনির্ভরশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। জনগণের স্পষ্ট দাবি কোনো ভূ-রাজনৈতিক ফাঁদে না পড়ে, দেশের অর্থনৈতিক ও সার্বভৌম স্বার্থকে সবকিছুর ওপরে স্থান দিতে হবে।
তথ্য সূত্র: রয়টার্স
