ডেস্ক রিপোর্ট | ঢাকা
ভর্তুকি সমন্বয়ের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেশে আবারও বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। এবার খুচরা বা গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম এক ধাক্কায় ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। নতুন এই মূল্য চলতি মাস থেকেই কার্যকর হবে বলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক নির্বাহী আদেশে জানানো হয়েছে। সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ খাতে ক্রমবর্ধমান সরকারি ভর্তুকি কমিয়ে আনতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি ছিল।
তবে দেশজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে সাধারণ আবাসিক গ্রাহক থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান সবারই মাসিক বিদ্যুৎ বিল উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে। আবাসিক বা সাধারণ বসত বাড়ির ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে বিল নির্ধারিত হলেও, প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ৫২ পয়সা বৃদ্ধি পাওয়ায় লাইফলাইন বা দরিদ্র গ্রাহক থেকে শুরু করে উচ্চ ব্যবহারকারী সবার পকেটে সরাসরি টান পড়বে। একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার যেখানে মাসে গড়ে ১০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়, সেখানে আগের চেয়ে বিল প্রায় ১৫২ টাকা বেড়ে যাবে। ২ বা ৩টি ফ্যান ও ফ্রিজ ব্যবহারকারী একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে মাসিক ২৫০ ইউনিট ব্যবহারের বিপরীতে বিদ্যুৎ বিল সরাসরি প্রায় ৩৮০ টাকা বাড়বে। অন্যদিকে, যাদের ঘরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি চলে এবং বিদ্যুৎ ব্যবহার ৪০০ ইউনিট বা তার বেশি, তাদের প্রতি মাসের বিদ্যুৎ বিল কমপক্ষে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহকদের ওপর এই ধাক্কা আসবে আরও তীব্রভাবে। বাণিজ্যিক লাইনে এমনিতেই বিদ্যুতের বেস রেট বা মূল দাম বেশি থাকে। নতুন করে প্রতি ইউনিটে সমহারে দাম বাড়ায় একটি মাঝারি আকারের দোকান, রেস্তোরাঁ বা অফিসের মাসিক বিল দেড় থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। বৃহৎ শিল্পকারখানা বা টেক্সটাইল মিল, যেখানে প্রতি মাসে লাখ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়, সেখানে উৎপাদন খরচ এক ধাক্কায় কয়েক লাখ টাকা বেড়ে যাবে।
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব কেবল বিদ্যুৎ বিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি পুরো জীবনযাত্রার ব্যয়কে চেইন রিঅ্যাকশনের মতো বাড়িয়ে দেবে। বিশেষ করে কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগারগুলোতে আলু, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন শাকসবজি ও ফল সংরক্ষণে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ লাগায়, সেখানে খরচ বৃদ্ধির অজুহাতে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরেক দফা বাড়তে পারে। পাশাপাশি শিল্পকারখানায় উৎপাদন খরচ বাড়লে তৈরি পোশাক, প্লাস্টিক, রড, সিমেন্টসহ সব ধরনের দেশীয় পণ্যের দাম বাড়বে, যার চূড়ান্ত দায় গিয়ে পড়বে সাধারণ ক্রেতার ওপর।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে জানিয়েছে, বাজারে সব জিনিসের দাম এমনিতেই চড়া, তার ওপর তীব্র গরমে মানুষ অতিষ্ঠ। এই সময়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দেওয়ার শামিল।
সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ খাতের লোকসান ও আন্তর্জাতিক সংস্থার শর্ত পূরণের যুক্তি দেওয়া হলেও, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা দাম বাড়ানোর পাশাপাশি সরকার যেন অন্তত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে এবং লোডশেডিংয়ের ভোগান্তি থেকে মুক্তি দেয়।
