সারা দেশের ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা কিছু বিচ্ছিন্ন সহিংসতার খবরকে সঙ্গে নিয়েই শেষ হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ। সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা—টানা নয় ঘণ্টার ভোটযজ্ঞে অংশ নেয় দেশের ২৯৯টি আসন। শুরুটা ছিল উৎসবের আমেজে, আর বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই আমেজ রূপ নেয় দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা ভোটারদের অপেক্ষায়। দুপুর গড়ানোর পর অনেক কেন্দ্রেই চোখে পড়ে ভিড়। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য, আর নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ অনেক জায়গাতেই আলাদা করে নজর কাড়ে।
দুপুর দুইটা পর্যন্ত ভোটের হার দাঁড়ায় ৪৭ দশমিক ৯১ শতাংশ। নির্বাচনকে ঘিরে নিরাপত্তার বলয় ছিল নজিরবিহীন। প্রায় ৯ লাখ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মাঠে দায়িত্ব পালন করেন, সঙ্গে এক লাখের বেশি সেনাসদস্য। দেশজুড়ে কড়া নজরদারি, টহল, চেকপোস্ট—সব মিলিয়ে রাষ্ট্র যেন পুরো প্রক্রিয়াকে নিরাপত্তার আবরণে মুড়ে রাখার চেষ্টা করেছে।
দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি কেন্দ্রে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি ভোটকক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ৫০টি রাজনৈতিক দল এই নির্বাচনে অংশ নেয়। মোট প্রার্থী ছিলেন ২ হাজার ২৮ জন—এর মধ্যে ১ হাজার ৭৫৫ জন দলীয় এবং ২৭৩ জন স্বতন্ত্র। নারী প্রার্থী ছিলেন ৮৩ জন। নিবন্ধিত ১০টি দল কোনো প্রার্থী দেয়নি। বড় দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দেয় বিএনপি।
ভোটের পাশাপাশি গণভোট ঘিরেও ছিল আলাদা আগ্রহ। দুপুর পর্যন্ত ১১ লাখের বেশি পোস্টাল ব্যালট রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছায়। প্রবাসীদের অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য—বিভিন্ন দেশে পাঠানো ব্যালটের বড় অংশই সংগ্রহ ও জমা পড়েছে, এবং তার উল্লেখযোগ্য অংশ ইতোমধ্যে দেশে এসে পৌঁছেছে। ফলে চূড়ান্ত ফলাফলে এই ডাকভোটের প্রভাব কতটা হবে, তা নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিসংখ্যানই বলে দেয়, রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতি ছিল ব্যাপক। সেনা, নৌ, বিমান, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, কোস্টগার্ড, র্যাব—সব বাহিনীর সদস্যরা মাঠে ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন নির্বাহী ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা, যাতে আচরণবিধি লঙ্ঘন বা নির্বাচন-সংক্রান্ত অপরাধের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই মাঠে সক্রিয় ছিল ভ্রাম্যমাণ আদালত।
দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। দেশীয় নিবন্ধিত সংস্থার হাজার হাজার পর্যবেক্ষক কেন্দ্রে কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গণমাধ্যম থেকে আগত বিদেশি প্রতিনিধিরাও পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছেন। ফলে এই নির্বাচন কেবল অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াই নয়, আন্তর্জাতিক মনোযোগেরও কেন্দ্রে ছিল।
সব মিলিয়ে ভোট শেষ, এখন অপেক্ষা ফলাফলের। সংখ্যার হিসাব, পোস্টাল ব্যালট, গণভোটের রায়—সব একসঙ্গে মিলিয়ে তৈরি হবে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা। উৎসব, উত্তেজনা, অভিযোগ, নিরাপত্তা, নজরদারি—সব পেরিয়ে এখন প্রশ্ন একটাই: জনগণের রায় কোন দিকে যাচ্ছে, আর সেই রায় দেশের রাজনীতিকে কোন নতুন পথে নিয়ে যাবে।
