গণআওয়াজ ডেস্ক
১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কলেজের ছুটি শুরু হলেও স্কুল নিয়ে কেন এই লুকোচুরি? ২০২৬ সালের শিক্ষাপঞ্জি, রমজানে ছুটি ও আদালতের চূড়ান্ত রায় নিয়ে বিশেষ বিশ্লেষণ।
আসন্ন রমজান মাসে কাঠফাটা রোদে রোজা রেখে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া নিয়ে দেশজুড়ে বইছে বিতর্কের ঝড়। একদিকে হাইকোর্ট জনস্বার্থে স্কুল বন্ধের ঐতিহাসিক নির্দেশ দিলেও, ঠিক ২৪ ঘণ্টার মাথায় রাষ্ট্রপক্ষের আপিলে সেই সিদ্ধান্তে এসেছে নাটকীয় মোড়। অভিভাবকরা যখন সন্তানদের ছুটির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশে তৈরি হয়েছে চরম ধোঁয়াশা। মাদ্রাসাগুলোতে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকেই ছুটির ঘণ্টা বাজলেও কেন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে ২১ রমজান পর্যন্ত ক্লাস চালানোর জেদ ধরছে মন্ত্রণালয়? কলেজের ছুটি শুরু হলেও স্কুলের ক্ষেত্রে কেন এই বৈষম্য?
২০২৬ সালের রমজান মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে নাকি বন্ধ হবে, তা নিয়ে দেশজুড়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হাইকোর্ট এবং চেম্বার জজ আদালতের পাল্টাপাল্টি আদেশের ফলে তৈরি হয়েছে এক জটিল আইনি ও প্রশাসনিক পরিস্থিতি। যেখানে একদিকে কোমলমতি শিশুদের ধর্মীয় আবেগ ও শারীরিক কষ্টের বিষয় উঠে এসেছে, অন্যদিকে সরকারের শিক্ষাপঞ্জি বজায় রাখার চ্যালেঞ্জও দৃশ্যমান। এই নিবন্ধে আমরা বিশ্লেষণ করব আসলে রমজানে ছুটি, কোন স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি কবে থেকে শুরু হচ্ছে এবং আদালতের চূড়ান্ত রায় /সর্বশেষ অবস্থান কী।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ১৫ ফেব্রুয়ারি, যখন বিচারপতি ফাহমিদা ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের হাইকোর্ট বেঞ্চ জনস্বার্থে করা এক রিটের প্রেক্ষিতে রমজান মাসে সরকারি-বেসরকারি নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। এই আদেশের মূল ভিত্তি ছিল শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় চর্চায় বিঘ্ন ঘটা এবং রমজানে যানজটের আশঙ্কা। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, ৮ মার্চের পরিবর্তে ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকেই মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলগুলো বন্ধ হওয়ার কথা ছিল।
তবে এই নির্দেশের একদিন পরই দৃশ্যপট বদলে যায়। রাষ্ট্রপক্ষ এই আদেশের বিরুদ্ধে চেম্বার জজ আদালতে আপিল করলে হাইকোর্টের সেই আদেশটি স্থগিত করা হয়। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনিক আর হকের ভাষ্যমতে, নিয়মিত আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আগের শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী স্কুল খোলা রাখাতে আর কোনো আইনি বাধা থাকছে না। ফলে আপাতত মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে ৭ মার্চ পর্যন্ত ক্লাস চলার সিদ্ধান্তই বহাল রয়েছে।
স্কুল নিয়ে আইনি লড়াই চললেও কলেজ পর্যায়ের চিত্রটি ভিন্ন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ প্রকাশিত ২০২৬ সালের ছুটির তালিকা অনুযায়ী, ১৮ ফেব্রুয়ারি বুধবার থেকেই দেশের সরকারি-বেসরকারি কলেজগুলোতে পবিত্র রমজান ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটি শুরু হয়েছে। এই ছুটির তালিকায় রমজান, ঈদুল ফিতর, স্বাধীনতা দিবস এবং সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে টানা ৩৯ দিন ক্লাস বন্ধ থাকছে। আগামী ২৯ মার্চ থেকে পুনরায় কলেজের পাঠদান শুরু হবে। কলেজের এই দীর্ঘ বিরতি মূলত রমজান ও গ্রীষ্মকালীন ছুটির সমন্বয়ে করা হয়েছে, যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেছে।
রমজানে ছুটি এই বৈষম্যই মূলত বিতর্কের মূল কেন্দ্রবিন্দু। মাদরাসাগুলোতে রমজানে ছুটি রমজান শুরুর আগেই অর্থাৎ ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ছুটি শুরু হয়ে গেলেও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে রমজানের বড় একটি অংশ ক্লাস চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ২১ রমজান পর্যন্ত ক্লাস চলার কথা রয়েছে। যদিও কিণ্ডারগার্টেন বা কেজি স্কুলগুলো তাদের নিজস্ব নিয়মে চলবে, সরকারি প্রাথমিকে আগের বছরের তুলনায় এবার ছুটির সংখ্যা ১২ দিন কমানো হয়েছে।
রিট আবেদনকারী আইনজীবী ইলিয়াছ আলী মণ্ডলের মতে, একই সরকারের অধীনে এক স্তরে রমজানে ছুটি আর অন্য স্তরে ক্লাস চলাটা স্পষ্ট বৈষম্য। বিশেষ করে গ্রীষ্মের দাবদাহে রোজা রেখে ছোট শিশুদের জন্য স্কুলে যাতায়াত করাটা বেশ কষ্টকর। এছাড়া রমজানে স্কুল খোলা থাকলে মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে যানজট তীব্র আকার ধারণ করে, যা জনজীবনে দুর্ভোগ বাড়িয়ে দেয়।
২০২৬ সালের শিক্ষাপঞ্জি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাধ্যমিক ও নিম্ন-মাধ্যমিকে এবার বেশ কিছু ধর্মীয় ও জাতীয় দিবসের ছুটি বাতিল বা কমানো হয়েছে। শবে মেরাজ, জন্মাষ্টমী ও আশুরার মতো দিনের ছুটি তালিকায় নেই। বছরের মোট ছুটি ধরা হয়েছে ৬৪ দিন। আগামী ২৪ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত ঈদুল আজহা ও গ্রীষ্মকালীন ছুটি মিলিয়ে ১২ দিনের বিরতি থাকবে। এছাড়া দুর্গাপূজায় ৫ দিন এবং শীতকালীন অবকাশে ১৭ থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কলেজগুলো বন্ধ থাকবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ শুনানির ওপর। শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের অবস্থানে অনড় থেকে বলছে, শিখন ঘাটতি মেটাতে রমজানের কিছু দিন ক্লাস হওয়া জরুরি। অন্যদিকে অভিভাবকদের বড় একটি অংশ চাচ্ছেন রমজানে যেন শিশুদের ওপর বাড়তি চাপ না দেওয়া হয়।
আপনি কি মনে করেন রমজানে শিখন ঘাটতি মেটাতে স্কুল খোলা রাখা সঠিক সিদ্ধান্ত, নাকি ছোট শিশুদের শারীরিক ও ধর্মীয় দিক বিবেচনা করে পূর্ণাঙ্গ ছুটি দেওয়া উচিত? কমেন্টে জানান!
