পাহাড়তলী থেকে ময়মনসিংহ, কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডব, চাঁদাবাজি, মাদক ও খুনের নেশায় মত্ত কিশোর অপরাধীরা, উত্তাল জনপদ এবং প্রশাসনের জিরো টলারেন্স নীতি।
গণআওয়াজ ডেস্ক
শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের আঙিনা—সবখানেই আজ এক আতঙ্কের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। তুচ্ছ ঘটনা থেকে শুরু করে প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংস হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি এবং মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছে আগামীর ভবিষ্যৎ। সম্প্রতি চট্টগ্রাম, আশুলিয়া এবং ময়মনসিংহে ঘটে যাওয়া ধারাবাহিক অপরাধের চিত্র সাধারণ মানুষকে করে তুলেছে শঙ্কিত। কেন এই কিশোররা হিংস্র হয়ে উঠছে? কারাই বা দিচ্ছে তাদের রাজনৈতিক শেল্টার? আজকের ব্লগে আমরা কিশোর গ্যাং কালচারের অন্ধকার জগত এবং এটি নির্মূলে করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
বাংলাদেশে কিশোর অপরাধের ধরন গত কয়েক বছরে আমূল বদলে গেছে। এক সময় যা ছিল নিছক আড্ডাবাজি বা পাড়া-মহল্লার ছোটখাটো ঝগড়া, তা এখন রূপ নিয়েছে সংঘবদ্ধ ‘কিশোর গ্যাং’ কালচারে। চট্টগ্রাম মহানগরীর পাহাড়তলী থানা এলাকার অলংকার মোড় থেকে শুরু করে ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়—সবখানেই কিশোর অপরাধীদের দাপট আজ চরমে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই গ্যাংগুলোর পেছনে কাজ করছে শক্তিশালী গডফাদার এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়া।
চট্টগ্রামের অলংকারে চাঁদাবাজির রাজত্ব
চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায় ‘সোর্স রনি’ নামক এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাং পরিচালনার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, রাস্তার টোকাই থেকে আজ লাখপতি হওয়া এই রনি কিশোরদের ব্যবহার করে এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং দখলদারিত্ব বজায় রাখছে। এমনকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে যুবদল কার্যালয় ভাঙচুর এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের থেকে দৈনিক ভিত্তিতে চাঁদা আদায়ের মতো ঘটনাও ঘটছে সেখানে। সিসিটিভি ফুটেজে এসব অপরাধের প্রমাণ মিললেও প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা। ভুক্তভোগীদের মতে, এই কিশোররা কেবল শিখণ্ডী, আসল কলকাঠি নাড়ছে আড়ালে থাকা ক্ষমতাশালীরা।
ময়মনসিংহে কলেজছাত্রের মৃত্যু ও কিশোর গ্যাং আতঙ্ক
ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের ছাত্র নুরুল্লাহ শাওনের মৃত্যু কিশোর গ্যাংয়ের নৃশংসতাকে আবারও সামনে এনেছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে ঘুরতে গিয়ে ছিনতাইকারী কিশোর গ্যাংয়ের ধাওয়ায় প্রাণ হারাতে হয়েছে এই মেধাবী শিক্ষার্থীকে। এর আগে জিলা স্কুলের এক শিক্ষার্থীকে তাদের দলে যোগ না দেওয়ায় সাতবার ছুরিকাঘাত করার মতো ঘটনাও ঘটেছে। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, এই কিশোররা সাধারণত দরিদ্র পরিবারের সন্তান এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় এদের আইনের আওতায় আনা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ছে। তবে পুলিশ ইতিমধ্যে অপরাধীদের তালিকা প্রস্তুত করে বিশেষ অভিযানের ঘোষণা দিয়েছে।
কেন বাড়ছে কিশোর অপরাধ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাং তৈরির পেছনে রয়েছে বহুমুখী কারণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের শিক্ষকদের মতে, পারিবারিক বন্ধন শিথিল হওয়া এবং অভিভাবকদের তদারকির অভাব এর প্রধান কারণ। পাশাপাশি ইন্টারনেটের অপব্যবহার, পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ এবং খুব অল্প বয়সে হাতে কাঁচা টাকা আসা কিশোরদের বিপথে পরিচালিত করছে। অপরাধ বিশ্লেষক ড. জিয়া মনে করেন, সমাজে যখন অপরাধীরা বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে বীরদর্পে ঘুরে বেড়ায়, তখন কিশোররা তাদের আদর্শ মানতে শুরু করে। তারা ভাবে, সন্ত্রাস করে পার পাওয়া সম্ভব, আর এই ‘হিরোইজম’ থেকেই জন্ম নেয় ‘নাইট স্টার’ বা ‘ডিসকো গ্রুপ’-এর মতো ভয়ঙ্কর গ্যাং।
রাজনৈতিক আশ্রয় ও প্রশাসনের ভূমিকা
কিশোর গ্যাং নির্মূলে এখন রাজনৈতিক সদিচ্ছার দাবি উঠছে। সম্প্রতি ময়মনসিংহের বিএনপির সংসদ সদস্য লুৎফুল্লাহেল মাজেদ এবং শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন। সংসদ সদস্য মাজেদ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের তালিকা তৈরি করে তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে এবং কোনো রাজনৈতিক নেতা যেন তাদের শেল্টার না দেয়। শিক্ষামন্ত্রীও সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বাজারগুলোতে চাঁদাবাজি বন্ধের ওপর জোর দিয়েছেন।
প্রতিরোধের উপায় ও সামাজিক সচেতনতা
কিশোর গ্যাং কালচার থেকে সমাজকে মুক্ত করতে কেবল পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন।
১. পারিবারিক সচেতনতা: সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে—সে বিষয়ে মা-বাবাকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হবে।
২. সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড: কিশোরদের খেলাধুলা এবং সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত রাখতে হবে যাতে তারা বিপথে যাওয়ার সময় না পায়।
৩. আইনি কঠোরতা: কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়ন এবং অপরাধীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. রাজনৈতিক অঙ্গীকার: অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তাকে আশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
পরিশেষে, কিশোর গ্যাং কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। এখনই যদি সম্মিলিতভাবে রুখে দাঁড়ানো না যায়, তবে আগামীর প্রজন্ম এক ভয়াবহ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে। নিরাপদ সমাজ গড়তে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সাধারণ মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে।
কিশোর গ্যাং নির্মূলে আপনার এলাকায় কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে? কমেন্ট বক্সে জানান।
