দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম দিনেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সামনে নতুন দিকনির্দেশনা তুলে ধরলেন নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তাঁদের স্পষ্ট বার্তা—“সবার আগে বাংলাদেশ”। অর্থাৎ, যে কোনো কূটনৈতিক পদক্ষেপে সর্বাগ্রে থাকবে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা।
বৃহস্পতিবার সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত পরিচিতিমূলক বৈঠকে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হবে। মন্ত্রণালয়ের একাধিক জ্যেষ্ঠ সূত্রের ভাষ্য, নতুন নেতৃত্ব কর্মকর্তাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন—সার্বভৌম সাম্য, পরস্পরের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং পারস্পরিক সুবিধা—এই নীতিগত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই এগোবে বাংলাদেশ।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’: নীতির অর্থ কী?
কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—তাহলে কি দীর্ঘদিনের ঘোষিত নীতি “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়” থেকে সরে এসে নতুন এক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হচ্ছে? মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টির বিস্তারিত ব্যাখ্যা নতুন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীই দিতে পারবেন। তবে ইঙ্গিত স্পষ্ট—বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু তার কেন্দ্রবিন্দু হবে জাতীয় স্বার্থ।
বৈঠকে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান–এর শাসনামলের পররাষ্ট্রনীতির কিছু দিকও আলোচনায় আসে। বিশেষ করে বহুমুখী কূটনীতি, নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র অবস্থান প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোকে প্রবাসীদের প্রতি আরও জনবান্ধব ও সেবামুখী হওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
গণতান্ত্রিক সরকারের ‘মেরুদণ্ড’ প্রসঙ্গ
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কর্মকর্তাদের সমন্বয়েই এ কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
নিজের অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় পর দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার এসেছে এবং সেই সরকারের পররাষ্ট্রনীতি হবে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও দৃঢ়। তাঁর ভাষায়, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আসা সরকার হিসেবে “মেরুদণ্ড সোজা করে” সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করবে বাংলাদেশ। অর্থাৎ, সম্পর্ক থাকবে সবার সঙ্গে, কিন্তু সিদ্ধান্ত হবে নিজস্ব স্বার্থের ভিত্তিতে।
আলোচনায় শেখ হাসিনা প্রত্যর্পণ ইস্যু
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা–কে ভারত থেকে ফেরত আনার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটি সরকারের প্রথম দিন; চলমান প্রক্রিয়া থাকলে তা নিয়ম অনুযায়ী এগোবে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি দেখবে।
ভিসা, গঙ্গার পানি ও গাজা প্রসঙ্গ
বিভিন্ন দেশের ভিসা বন্ধ বা সীমিতকরণ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, মন্ত্রণালয় বিষয়টি সম্পর্কে অবগত এবং সমাধানের উপায় খোঁজা হচ্ছে।
গঙ্গার পানিচুক্তি কিংবা গাজায় সৈন্য পাঠানোর প্রশ্নে তিনি বলেন, এখনো এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়নি। সরকারের দ্বিতীয় দিন চলছে; রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এলে তা পরবর্তীতে জানানো হবে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের নিজস্ব ইস্যু ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেসব সমাধানে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কূটনীতি—দুই পথেই এগোতে হবে। লক্ষ্য একটাই—বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ সুরক্ষিত করা।
কূটনীতিতে নতুন ভাষা, না কি পুরোনো অঙ্গীকারের পুনর্বিন্যাস?
“সবার আগে বাংলাদেশ”—এই স্লোগান নতুন নয়, তবে সরকারিভাবে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় বার্তা হিসেবে এর পুনরুচ্চারণ কূটনৈতিক মহলে তাৎপর্য তৈরি করেছে। এটি কি কেবল অগ্রাধিকারের ভাষাগত পুনর্বিন্যাস, নাকি বাস্তবে কূটনৈতিক অবস্থানে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে—তা সময়ই বলবে।
তবে প্রথম দিনের বার্তায় স্পষ্ট হয়েছে, নতুন নেতৃত্ব পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি সক্রিয়, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন এবং স্বার্থকেন্দ্রিক কূটনীতির পথে দেখতে চায়। এখন দেখার বিষয়—এই ঘোষিত নীতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কীভাবে প্রতিফলিত হয়।

I think the present government will broadly continue the foreign policy espoused by the the interim government.