রামিসা হত্যা মামলা: ১৯ দিনের ‘রকেটস্পিড’ বিচার, নাকি তড়িঘড়ির আড়ালে গভীর কোনো ফাঁক?

শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন | গণ আওয়াজ

নৃশংসতা যখন ডালভাত হয়ে যায়, রাষ্ট্র তখন মাঝে মাঝে চমক দেখাতে ভালোবাসে। রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় আজ রায় এসেছে। প্রধান আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার উভয়কেই আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। ৫ লাখ টাকা জরিমানাও হয়েছে।
সাধারণ চোখে এটি এক বিরাট ‘বিজয়’। একটি ৮ বছরের শিশুর এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর আসামিদের ফাঁসির আদেশে জনমনে স্বস্তি আসাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই রায়ের পেছনে যে ‘রেকর্ড’ তৈরি হলো, তা কি আসলেই ন্যায়বিচারের দৃষ্টান্ত, নাকি বিচার ব্যবস্থার এক চরম নাটকীয় স্ট্যান্টবাজি? এই প্রশ্নটাই এখন বড় হয়ে উঠছে সচেতন মহলে।
বিচার নাকি অলৌকিক কোনো ম্যাজিক?
বাংলাদেশী পত্রিকাগুলো আজ মেতে উঠেছে এক অদ্ভুত উদযাপনে। বলা হচ্ছে, দেশের ইতিহাসের ‘দ্রুততম বিচার’। গত ১৯ মে ঘটনা ঘটল, আর আজ ৭ জুন মাত্র ১৯ দিনের মাথায় রায়!
একটু ঠান্ডা মাথায় হিসাব কষে দেখা যাক:
 ১ জুন: আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন।
 ২ জুন: মাত্র ১ দিনে ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ এবং জেরা শেষ!
 ৫ কার্যদিবস: পুরো বিচার প্রক্রিয়া শেষ করতে আদালতের সময় লাগল মাত্র ৫ দিন।
যে দেশে লাখ লাখ মামলার জট লেগে আছে, যে দেশে খুনের মামলার ডেট পড়তে পড়তেই বছরের পর বছর কেটে যায়, সেখানে মাত্র ৫ দিনে একটি হত্যা ও ধর্ষণ মামলার বিচার কীভাবে সম্পন্ন হয়? ১ দিনে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ এবং জেরা কতটা নিখুঁতভাবে করা সম্ভব, তা নিয়ে খোদ আইনজ্ঞদের মনেই খটকা তৈরি হয়েছে।

ন্যায়বিচারের একটা পুরোনো কথা আছে “Justice hurried is justice buried” (তড়িঘড়ি করে পাওয়া বিচার আসলে বিচারকে কবর দেওয়ার শামিল)। জনরোষ সামাল দিতে রাষ্ট্র যেভাবে ‘রকেট গতিতে’ এই বিচার শেষ করল, তাতে আসামিপক্ষ আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত আইনি সুযোগ পেয়েছে তো? নাকি ওপর মহলের কোনো বিশেষ নির্দেশে জাস্ট একটা ফাইল তাড়াহুড়ো করে বন্ধ করা হলো?

ঘটনাটি নিঃসন্দেহে গা শিউরে ওঠার মতো। প্রতিবেশী সোহেল রানা ও তার স্ত্রী যেভাবে রামিসাকে ঘরের ভেতর ডেকে নিয়ে এই পাশবিক নির্যাতন চালাল এবং পরে মাথা কেটে বাথরুমে লুকিয়ে রাখল, তা কোনো সুস্থ মানুষের কাজ হতে পারে না। ৩ জুন আদালতে সোহেল রানা নিজের অপরাধ স্বীকারও করেছে।
কিন্তু ‘গণ আওয়াজ’ সবসময় ক্ষমতার ভেতরের রাজনীতিটা দেখতে চায়। এই দ্রুততম বিচারের কৃতিত্ব নিয়ে রাষ্ট্র যখন নিজের পিঠ চাপড়াচ্ছে, তখন পর্দার আড়ালের প্রশ্নগুলো কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে না:
১. এই একই গতি দেশের বাকি হাজার হাজার শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে দেখা যায় না কেন?
২. অপরাধী যদি কোনো প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তি হতো, তখনও কি ১৯ দিনে রায় আসত?


আদালতের পর্যবেক্ষণে বিচারক মাসরুর সালেকীন বলেছেন, এই অপরাধ সংশোধনযোগ্য নয়। আদালতের বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে এই শাস্তি জরুরি ছিল। বিচারকের এই বক্তব্যই প্রমাণ করে, আদালত এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক চাপে ছিল জনগণের চোখ এবং মিডিয়ার ক্যামেরার চাপ।

রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা আজ সন্তোষ প্রকাশ করেছেন, দ্রুত ফাঁসি কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন। একজন সন্তানহারা বাবার এই চাওয়া শতভাগ যৌক্তিক। অপরাধীদের শাস্তি হতেই হবে।
কিন্তু রাষ্ট্র যখন কোনো একটি নির্দিষ্ট মামলাকে বেছে নিয়ে ‘রেকর্ড’ বানানোর প্রতিযোগিতায় নামে, তখন বুঝতে হবে ডালমে কুছ কালা হ্যায়। পল্লবীর রামিসা হত্যা মামলার এই ১৯ দিনের রায় কি আসলেই বাংলাদেশের বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙার প্রথম ধাপ, নাকি স্রেফ একটি আইওয়াশ তা সময়ই বলে দেবে। কারণ, উচ্চ আদালতে আপিলের পর এই মামলা কত বছর ঝুলে থাকে, সেটাই হবে আসল পরীক্ষা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *