বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি গত কয়েকটি বছর ধরে এক নজিরবিহীন ও বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে তৈরি হওয়া নজিরবিহীন টানাপোড়েন, মার্কিন ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা টাকার অস্বাভাবিক অবমূল্যায়ন, ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা এবং রেকর্ড মূল্যস্ফীতি সব মিলিয় এক তীব্র চাপ তৈরি করেছে।
এই পটভূমিতেই তৎকালীন এবং পরবর্তীতে মেয়াদি সংস্কারের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তা গ্রহণ করা হয়, যার পরিধি ও সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে বর্তমানেও নতুন মেয়াদি আলোচনা (Successor Arrangement) অব্যাহত রয়েছে। তবে এই ঋণ কেবল আর্থিক সহায়তার গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; আইএমএফ-এর বেঁধে দেওয়া নজিরবিহীন কঠোর অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত শর্তাবলী দেশের সামগ্রিক নীতিনির্ধারণী পরিবেশ, বাজারব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এক ব্যাপক রূপান্তর ও গভীর প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
আইএমএফ-এর সংস্কার কর্মসূচির সবচেয়ে বড় ও সংবেদনশীল জায়গাটি হলো রাজস্ব বিভাগ এবং দেশের কর কাঠামোর আমূল পরিবর্তন। বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর অফিশিয়াল পরিসংখ্যান ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, বিশ্বজুড়ে সর্বনিম্ন কর-জিডিপি অনুপাতের দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ অন্যতম, যা দীর্ঘদিন ধরে গড়ে মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশের ঘরে অবস্থান করছে। এই হার বাড়াতে আইএমএফ প্রতি অর্থবছর শেষে জিডিপির অন্তত ০.৫ শতাংশ অতিরিক্ত কর আদায়ের শর্ত জুড় দেয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রশাসনিক আধুনিকায়নসহ ঢালাও কর অব্যাহতি (Tax Exemptions) প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়।
তবে দেশের প্রধান অর্থবিষয়ক সংবাদ মাধ্যম ‘দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস’ ও ‘দৈনিক প্রথম আলো’-র ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে চিত্রটি অন্যভাবে ফুটে উঠেছে। সাংবাদিক ও অর্থনৈতিক গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, আইএমএফ-এর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা দ্রুত অর্জনের তাগিদে নীতিনির্ধারকেরা ধনিক শ্রেণীর ওপর আয়কর ও প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদী পথের বদলে ভ্যাটের (VAT) মতো পরোক্ষ কর বাড়ানোর ওপরই বেশি জোর দিয়েছেন। এতে বিত্তশালীদের করের আওতায় আনার চেয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটায় পরোক্ষ করের বোঝা বেড়ে শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তা ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ওপরই মূল আর্থিক চাপটি এসে পড়েছে।
আইএমএফের রাজস্ব সংস্কারের মূল লক্ষ্য করের আওতা বাড়ানো হলেও বাস্তবে তা পরোক্ষ করের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের পকেট কাটায় রূপ নিয়েছে।
অন্যতম বিতর্কিত শর্তটি ছিল বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি তেল খাতে সরকারের দেওয়া বিশাল অঙ্কের সরকারি ভর্তুকি প্রত্যাহার করা এবং বিশ্ববাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি স্বয়ংক্রিয় বা ফর্মুলাভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা (Automatic Pricing Mechanism) চালু করা। আইএমএফ-এর দৃষ্টিকোণ থেকে এর উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ঘাটতি কমানো এবং সরকারের বাজেটের ওপর থেকে অপ্রয়োজনীয় আর্থিক চাপ অপসারণ করা। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে এই শর্তের প্রভাব পড়েছে সরাসরি উৎপাদন ও সাধারণ জীবনযাত্রায়। অর্থনৈতিক দৈনিক ‘বণিক বার্তা’ ও ‘বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’-এর জ্বালানি খাত সংক্রান্ত বিশেষ বিশ্লেষণে দেখা যায়, আইএমএফ-এর পরামর্শে ভর্তুকি কমিয়ে ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম এক লাফে বহুগুণ বাড়ানোর ফলে কৃষি, শিল্প উৎপাদন এবং বিতরণ ব্যবস্থার খরচ মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা জোর দিয়ে বলেছেন যে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দরবৃদ্ধির এই শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া (Chain Effect) দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত তৈরি পোশাক (RMG) শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা যেমন নষ্ট করেছে, তেমনি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোকে (SME) একেবারে বন্ধ হওয়ার মুখোমুখি নিয়ে দাঁড় করিয়েছে।
জ্বালানি খাতে ভর্তুকি প্রত্যাহারের সরাসরি মাসুল দিচ্ছে উৎপাদন খাত; যার খেসারত দিতে হচ্ছে মূল্যস্ফীতি ও বন্ধ হতে বসা ক্ষুদ্র শিল্পকে।বৈদেশিক মুদ্রার বাজার স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে আইএমএফ শুরু থেকেই কৃত্রিমভাবে ডলারের দর ধরে রাখার কঠোর বিরোধিতা করে আসছিল এবং ‘ক্রলিং পেগ’ (Crawling Peg) পদ্ধতির মাধ্যমে বা অবাধ বাজার ব্যবস্থার ভিত্তিতে ডলারের বিনিময় হার নির্ধারণের শর্ত আরোপ করে। বহু বছর ধরে প্রশাসনিক আদেশে ডলারের দাম চেপে রাখার অভ্যাস থেকে হঠাৎ এই মুক্তবাজার নীতির দিকে যাওয়ার ফলে স্থানীয় মুদ্রা টাকার মারাত্মক অবমূল্যায়ন ঘটে। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজার বিশ্লেষকদের মতে, টাকার মান এক ধাক্কায় এতখানি কমে যাওয়ার ফলে তৈরি হয় তীব্র ‘আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতি’ (Imported Inflation)। এর সরাসরি প্রভাবে ভোজ্যতেল, গম, ডাল, সার, জ্বালানি এবং শিল্প কারখানার আমদানিকৃত কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতির দাম নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বেড়ে যায়। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকনোমিক মডেলিং (সানেম)-এর নির্বাহী পরিচালক ও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছেন যে, পর্যাপ্ত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী (Social Safety Net) তৈরি না করে হঠাৎ বাজারভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দুই অংকের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, যা নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষকে চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
কৃত্রিমভাবে চেপে রাখা ডলারের বাঁধ ভাঙতেই যে আমদানি খরচের পাহাড় তৈরি হয়েছে, তার ধস পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনিক রান্নাঘরে।ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর অবস্থা এবং সুশাসনের অভাব দূর করা ছিল আইএমএফ কর্মসূচির আরেকটি প্রধান স্তম্ভ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (IMF Financial Soundness Indicators) অনুসরণ করে হিসাব করার শর্ত দেওয়ায় এতদিন নথিপত্রে যে খেলাপি ঋণ (NPL) কমিয়ে দেখানোর প্রবণতা বা পুনঃতফসিলীকরণের সুযোগ ছিল, তা উন্মোচিত হতে শুরু করে। ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর ব্যাংকিং খাত কেন্দ্রিক ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উন্মোচিত হয় যে, নথিপত্রে খেলাপি ঋণ যত শতাংশ দেখানো হতো, প্রকৃত খেলাপি ও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের পরিমাণ তার চেয়ে বহুগুণ বেশি। আইএমএফ-এর শর্ত মেনে সুদের হারের সীমা তুলে দেওয়া এবং কড়া মুদ্রানীতি (Tight Monetary Policy) বাস্তবায়নের ফলে ব্যাংক থেকে ব্যবসায়িক ঋণ নেওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে পড়ে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-র সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছিলেন যে, ব্যাংকিং খাতের মূল ব্যাধি হলো রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা বড় বড় ঋণখেলাপিরা। শুধু হিসাব করার নিয়ম পরিবর্তন করে বা সুদের হার বাড়িয়ে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া খেলাপি ঋণ কিংবা মূলধন পাচার আটকানো সম্ভব নয়।
হিসাবের খাতা বদলে খেলাপির নতুন সংজ্ঞা তৈরি করা সহজ, কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরানো অসম্ভব।আইএমএফ ঋণের এই দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ায় কিছু কাঠামোগত সুফল এবং স্পষ্ট কুফল উভয়ই দৃশ্যমান। দীর্ঘমেয়াদী সুফলের কথা চিন্তা করলে, এই চুক্তির ফলে রাষ্ট্রীয় বাজেটের অহেতুক ব্যয় সংকুচিত হয়, বৈদেশিক ঋণ ও রাজস্ব ব্যবস্থার মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং বিশ্বব্যাংক বা এডিবির মতো অন্যান্য বৈশ্বিক আর্থিক সংস্থার কাছ থেকে অতিরিক্ত উন্নয়ন সহায়তা পাওয়া সহজ হয়। এছাড়া ব্যাংক খাত ও এনবিআর-এ দীর্ঘদিনের লুকিয়ে রাখা তথ্য ও অসংগতি প্রকাশ পাওয়ায় টেকসই সংস্কারের সুযোগ তৈরি হয়। অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদী কুফল বা ঝুঁকির দিকটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। সামাজিক সুরক্ষার তোয়াক্কা না করে দ্রুত ভর্তুকি প্রত্যাহার, গ্যাস-বিদ্যুতের অনিয়ন্ত্রিত দাম বৃদ্ধি, সুদের হার ও পরোক্ষ করের ধাক্কায় দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার ও বেসরকারি বিনিয়োগে মন্দা দীর্ঘায়িত হতে পারে। একই সাথে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির সাথে আয়ের সামঞ্জস্য না থাকায় নতুন করে বিপুল সংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার বড় ধরণের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
যেকোনো আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার দেওয়া প্রেসক্রিপশন অন্ধভাবে মেনে নেওয়া কিংবা একেবারে অস্বীকার করা কোনোটিই টেকসই সমাধান হতে পারে না। আইএমএফ ঋণের শর্তাবলী বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের পাশাপাশি দেশের নিজস্ব বাস্তবতা ও জনগণের সামাজিক সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিত্তশালীদের কর ফাঁকি রোধ, সম্পদ পাচার বন্ধ এবং ব্যাংকিং খাতের মূল লুটেরাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করে কেবল সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতি ও ভ্যাটের চাপ বাড়ানো হলে দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য ভেঙে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক ঋণের শর্ত পূরণ যেমন একটা কৌশল হতে পারে, ঠিক তেমনি অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, নীতিগত স্বচ্ছতা এবং নিজস্ব অর্থায়নের সক্ষমতা অর্জন করাই হবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মুক্তির একমাত্র টেকসই পথ।
